ভারতীয় রাজনীতিতে মমতার রাজনৈতিক অধ্যায় কি শেষ
ভারতের রাজনীতিতে আঞ্চলিকতাবাদ বহু পুরোনো বিষয়। সেই আঞ্চলিকতাবাদের ধারাবাহিকতায় এত দিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) ঠেকিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু সর্বশেষ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয় মমতার সেই দুর্গে ধস নামিয়েছে।
মমতার দল তৃণমূল কংগ্রেসই শুধু নির্বাচনে হারেনি, একই সঙ্গে তিনি নিজেও বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে তাঁর নিজ আসনে হেরেছেন। আর সেই সঙ্গে মমতার দলেও ভাঙন দেখা দিয়েছে। দলের নির্বাচিত বিধায়ক ও লোকসভা-রাজ্যসভার এমপিরা পর্যন্ত মমতার বিরুদ্ধে চলে গেছেন এবং অনেকে বিজেপিকে কেন্দ্র এবং আঞ্চলিক বিধানসভায় সমর্থন দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে দুটি বিষয় নিয়ে। এক. মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার কি শেষ এবং দুই. তিনি তাঁর পুরোনো দল সর্বভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে ফিরবেন কি না।
এসব প্রশ্নের সহজ কোনো উত্তর নেই। নানা শর্ত ও বিদ্যমান বাস্তবতার আলোকে হিসাব-নিকাশ প্রয়োজন। তবে যে বিষয়টি না বললেই নয়—মমতা কেন হারলেন এবং তাঁর দল কেন ভাঙনের মুখে, সেই বিষয়ের সুলুক সন্ধান প্রয়োজন। মমতা মূলত তাঁর নিজের ফাঁদেই পড়ে গিয়েছিলেন। কারণ, তিনি সিঙ্গুরে টাটার বিনিয়োগ বন্ধের আন্দোলন করে ক্ষমতার শীর্ষে উঠে এসেছিলেন। কিন্তু টানা ১৫ বছর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি রাজ্যের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ঘটাতে পারেননি। এ কারণে, রাজ্যের তরুণদের বেকারত্বের হারও ব্যাপক বেড়ে গিয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে মমতার সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের অসন্তোষ ছিল।
এ ছাড়া স্থানীয় কিংবা তৃণমূল পর্যায়ে তাঁর দলের নেতাদের লাগামহীন আচরণ, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে একেবারে তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত দুর্নীতির অভিযোগ এবং দলের নেতৃত্বে ভাতিজা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মতো অভিযোগ ছিল।
সাম্প্রতিক সময়ে যখন তৃণমূলের বিধায়ক-এমপিরা দল ছেড়ে যাচ্ছেন, তখন তাঁরা অভিযোগ হিসেবে এসব বিষয় সামনে এনেছেন। বিশেষ করে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যাপারে তৃণমূল কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতা, এমপি-বিধায়কদের অভিযোগ এন্তার। অনেকে মমতার শাসনকে বাংলাদেশে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার শাসনের সঙ্গে তুলনা করেন। এর খানিকটা প্রমাণও পাওয়া যায় খোদ মমতার কথা থেকে। শেখ হাসিনা যেমন সরকার এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগে সর্বেসর্বা হয়ে উঠেছিলেন, মমতাও ঠিক তাই। তাঁর এই মনোভাব থেকে তিনি চলতি বছরের এপ্রিলের শুরুতে বিধানসভা নির্বাচনের আগে ঘোষণা দেন, ‘মনে রাখবেন, সব আসনেই আমি প্রার্থী।’
মমতার এই বক্তব্য একই সঙ্গে তাঁর চরম আত্মবিশ্বাস, সর্বেসর্বা হয়ে ওঠা এবং দলের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ ও আস্থা হারানোর ইঙ্গিত। এবং এটাও তৃণমূল কংগ্রেসের ভেঙে পড়ার অন্যতম কারণ।
আর এখান থেকে আলাপ শুরু করা যেতে পারে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ, নাকি তিনি গান্ধী পরিবারের নেতৃত্বাধীন দল কংগ্রেসে, তাঁর নিজের রাজনৈতিক আঁতুড়ঘরে ফিরে যাবেন। এই দুটি প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাবে—তৃণমূল কংগ্রেসের ওপর মমতার নিয়ন্ত্রণ কতটা এবং কংগ্রেস নেতৃত্ব ও মমতার দলের নেতারা একীভূত হওয়ার বিষয়টি কীভাবে বিচার করবেন, তার জবাব থেকে। অবশ্য, মমতার দলের টিকে থাকা এবং কংগ্রেসে ফেরার বিষয়টি বোঝার জন্য শারদ পাওয়ারের কেসও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
ভারতে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের প্রচারের সময় শারদ পাওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, ‘আগামী দুই বছরের মধ্যে একাধিক আঞ্চলিক দল কংগ্রেসের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হবে, অথবা তারা কংগ্রেসে একীভূত হওয়ার বিকল্প বিবেচনা করতে পারে।’ নিজ দল ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি সম্পর্কে পাওয়ার বলেন, তিনি তাঁর দল এবং কংগ্রেসের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখেন না।
শারদ পাওয়ার এমন কোনো ব্যক্তি নন, যিনি হঠাৎ মুখে যা আসে, তা-ই বলেন। তাঁর কথা পরিমিত এবং সময় নির্বাচনেও অত্যন্ত সচেতন। তাই তাঁর মন্তব্য থেকে স্পষ্টই বোঝা গিয়েছিল, এটি ছিল একটি ‘ট্রায়াল বেলুন’ বা কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়া যাচাইয়ের কৌশল। এমন পরিস্থিতিতে প্রবীণ শারদ পাওয়ার হয়তো রাজ্য নির্বাচনে পরিস্থিতি পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতিতে বড় ভূমিকার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখতে চেয়েছিলেন।