কয়েক সপ্তাহ ধরে সব শ্রেণির নাগরিকের জন্য দুশ্চিন্তা, ভোগান্তি, উদ্বেগ, বিরক্তি আর অসন্তোষের বড় কারণ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি। একদিকে মানুষ (বিশেষ করে গ্রামে) লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়েছে, অন্যদিকে ভুতুড়ে বিদ্যুতের বিল তাদের ঘাড়ে এসে চেপেছে।
আমাদের জ্বালানি খাত এমনিতেই জোড়াতালি দিয়ে চলছে। এরপর গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে অবস্থিত দুটি এলএনজি টার্মিনালের একটিতে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় পুরো অর্থনীতি আর জনজীবনের ওপর এর বড় প্রভাব পড়েছে। সিএনজি পাম্পে গাড়িগুলোকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে গ্যাসের জন্য। কারখানায় কাজ বন্ধ রেখে শ্রমিকদের ছুটি দিয়ে দিতে হয়েছে, গ্যাসের দেখা না মেলায় অনেকের বাসায় ভাতের হাঁড়ি চড়েনি, ভ্যাপসা গরমে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে গ্রাম ও মফস্সলের বাসিন্দারা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন। অনেকের ব্যবসা–বাণিজ্য ক্ষতির মুখে পড়েছে।
জ্বালানি ও বিদ্যুতের এই যে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি, উত্তরাধিকারসূত্রেই বর্তমান সরকারের ওপর চেপে বসেছে। এর ওপর আবার শপথ নেওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো শুরু হয় ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ। এ যুদ্ধে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড স্পর্শ করে। এলএনজির দামও অনেক বেড়ে যায়। এর সঙ্গে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় পরিবহন, বিমাসহ অন্যান্য ব্যয়ও বেড়ে যায়। পরিস্থিতি সামলাতে সরকার এক দফা জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়ায়। তাতে সাড়ে তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা মূল্যস্ফীতির পালে নতুন ধাক্কা এসে লাগে।
এর মধ্যে ভুতুড়ে বিল নাগরিকদের অসন্তোষের বড় কারণ হয়ে ওঠে। বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের ঘাড়ে যে ভুতুড়ে বিল চাপিয়ে দিয়েছে, সেটাও তারা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়ে এসেছে। সূত্রটা খুব সরল। পিডিবির কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনে গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দেয় বিতরণ কোম্পানিগুলো।
অর্থবছরের ১১ মাস ধরে যে ‘সিস্টেম লস’ হয় (এর বড় অংশই আসলে সিস্টেমেটিক চুরি ও অপচয়), তা পুষিয়ে নিতে একবারে গ্রাহকের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয় ভুতুড়ে বিল। এই ভুতুড়ে বিল নিয়ে যখন গ্রাহকেরা তাঁদের অসন্তোষ ফেসবুকে ঝাড়ছিলেন, তখনই বিদ্যুৎ বিভাগ বিবৃতি দিয়ে হুমকি দেয়— তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালালে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এত বড় অভ্যুত্থানের পর যখন আর কিছু না হোক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাগরিকের ক্ষোভ প্রকাশের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেই বাস্তবতায় বিদ্যুৎ বিভাগের এ হুমকিমূলক বিবৃতি ছিল কাটা ঘায়ে নুনের ছিটের মতো। নাগরিকদের অনেকে ফেসবুকে বিদ্যুৎ বিলের ছবি পোস্ট করে দেখান, আগের মাসগুলোর চেয়ে জুন মাসে বিদ্যুৎ বিল কতটা বেশি এসেছে।
যা হোক, ভার্চ্যুয়াল সামাজিক ক্ষোভের মুখে পিছু হটে বিদ্যুৎ বিভাগ, বিবৃতি প্রত্যাহার করে নেয়। প্রশ্ন হচ্ছে, কারিগরি–অকারিগরি যে ত্রুটির যুক্তিই দেওয়া হোক না কেন, জুন মাস এলেই কেন ভুতুড়ে বিল তৈরি হবে? এর জন্য কাউকে কি কখনো জবাবদিহি করতে হয়েছে? কিংবা বছরের পর বছর ধরে সিস্টেম লসের নামে যে চুরি চলে আসছে তার জন্য কাউকে ধরা হয়েছে?
৮ জুলাই দৈনিক সমকালের প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, অবৈধ সংযোগ, চুরি, লিকেজ ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতায় বছরে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার গ্যাসের অপচয় হচ্ছে। গ্যাসের ক্ষেত্রে বর্তমানে সিস্টেম লস ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এর মধ্যে অনুমোদিত কারিগরি অপচয় সর্বোচ্চ ২ শতাংশ। এর অর্থ বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার গ্যাস চুরি হয়। বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও সিস্টেম লস ১০ শতাংশের ওপরে। অথচ আন্তর্জাতিক আদর্শ হচ্ছে ২ শতাংশ সিস্টেম লস। ফলে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি সিস্টেম লসের নামে যেটা চালিয়ে দিতে চায় তারও বড় একটা অংশ স্রেফ চুরি। বিপিসির আমদানি করা জ্বালানি তেল বিতরণের সময়ও ডিপোকেন্দ্রিক সিন্ডিকেটের মাধ্যমে যে চুরি হয়, সেটাকেও সিস্টেম লস হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হয়।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চুরি বন্ধ না করে, সিস্টেম লসের বোঝা নাগরিকের ঘাড়ে শাস্তি হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার এই চর্চা কি চলতেই থাকবে?