বিমা খাত দেশের একটি অগ্রাধিকারমূলক আর্থিক খাত। তা সত্ত্বেও দুর্নীতি ও স্বচ্ছতার অভাব এবং জনগণের আস্থাহীনতায় নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে খাতটি। সোজা কথায়, খাতটি এগোতে পারছে না। এক তথ্যমতে, বাংলাদেশের জিডিপির তুলনায় বিমা খাতের অবদান অত্যন্ত নগণ্য, যা মাত্র ০.৩০ থেকে ০.৫০ শতাংশে অবস্থান করছে। ২০১০ সালে এ হার ছিল প্রায় ০.৯০ শতাংশ। এ খাতে ৮২টি কোম্পানি রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে ৩৬টি জীবনবিমা এবং ৪৬টি সাধারণ বিমা সক্রিয়। অথচ আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার মতো বিশাল অর্থনীতির দেশে এত বিমা কোম্পানি নেই। এত বড় রাষ্ট্র ভারতে মাত্র ৫৮টি বিমা কোম্পানি রয়েছে, পাকিস্তানে ৪০টি এবং শ্রীলংকায় ১৮টি। তাহলে আমাদের দেশে এত বিমা কোম্পানি কেন? এত কোম্পানির দরকার আছে বলে তো মনে হয় না। এত জীবনবিমারও দরকার নেই, এত সাধারণ বিমারও দরকার নেই। দেশের অর্থনীতি যেটা ধারণ করতে পারবে না, যেটা অপ্রয়োজনীয়-সেগুলো রাখার কি প্রয়োজন আছে? সরকার কেনই বা এগুলোকে অনুমোদন দিয়েছে, আমার জানা নেই।
দেশে এমন কিছু বিমা কোম্পানি রয়েছে, যারা সাইনবোর্ড টাঙিয়ে নামসর্বস্ব কোম্পানি খুলে জনগণের কাছ থেকে প্রিমিয়াম নিয়ে সময়মতো বিমাকারীর দাবি পরিশোধ করতে পারে না। এর কারণ হচ্ছে, তথাকথিত এজেন্সি ব্যবসা। এ এজেন্সি মানে ব্যক্তি, যারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নানারকম প্রচারণা চালিয়ে বিমা করিয়ে প্রিমিয়াম সংগ্রহ করে। আমার শোনামতে, এসব কোম্পানি ১০০ টাকার প্রিমিয়ামের মধ্যে ৭০ টাকাই এজেন্টকে কমিশন হিসাবে দিয়ে দেয়। তাহলে কোম্পানির থাকে মাত্র ৩০ টাকা। এ ৩০ টাকা থেকে বিমাকারীকে কতটুকুই বা দিতে পারবে কোম্পানি। যদি বিমার দায় বহন করত কোম্পানি, সে দায় বহন করতে ১০০ টাকার প্রিমিয়ামের মধ্যে এজেন্টকে ৭০ টাকাই দিয়ে দেয়। এটা তো হাস্যকর। এদের উদ্দেশ্যই তো খারাপ। বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথোরিটি (আইডিআরএ) আগে সবসময় লিবারেল ছিল। কিন্তু বর্তমানে মনে হচ্ছে, এরা দেখেও না দেখার মতো পর্যায়ে রয়েছে। বিমা খাতের আমূল সংস্কারের জন্য একটি উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার, যা এ খাতের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমাদের বিশ্বাস। আইডিআরএ-তে নতুন একজন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আশা করি, তিনি শক্ত হাতে বিমাশিল্পের তদারকি করবেন এবং এ শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করবেন।
বিমার দাবি পরিশোধের হারও তুলনামূলক অনেক কম। বিমা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে গ্রাহকদের বৈধ দাবি পরিশোধে অনীহার ব্যাপক অভিযোগ আছে। রাষ্ট্রায়ত্ত পুনর্বিমাকারী প্রতিষ্ঠান সাধারণ বিমা করপোরেশনের দাবি নিষ্পত্তিতেও চরম ধীরগতি লক্ষণীয়, যেখানে ২০২১ সালের ফাইল ২০২৬ সালে প্রক্রিয়াকরণ করা হচ্ছে। জীবনবিমায় ৩৪ শতাংশ এবং সাধারণ বিমায় মাত্র ১০ শতাংশ দাবি পরিশোধের হার বিদ্যমান, যা বিমাশিল্পের জন্য উদ্বেগজনক। এছাড়া ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ২৬ লাখেরও বেশি পলিসি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে তামাদি হয়েছে, যা বিমা খাতে আস্থার বড় সংকটের ইঙ্গিত দেয়। বিমার দাবি নিষ্পত্তিতে যেসব বিমা কোম্পানি ব্যর্থ হয়েছে, তাদের ব্যাপারে মন্ত্রী মহোদয় বলেছেন, এসব কোম্পানির সম্পত্তি বিক্রি করে হলেও বিমাকারীদের দায় পরিশোধ করতে হবে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন বিমা কোম্পানির ৭০ হাজার কোটি টাকা দায় নিষ্পত্তিহীন অবস্থায় রয়েছে। মানে বিমাকারীদের দাবি নিষ্পত্তি করা হয়নি। যেসব বিমা কোম্পানি বিমাকারীদের দাবি নিষ্পত্তি করতে পারেনি, ব্যর্থ হয়েছে-সেসব বিমা কোম্পানিকে পুরোপুরি বাদ দিতে হবে। তারা মানুষের কাছ থেকে প্রিমিয়াম আকারে যেসব টাকাপয়সা নিয়েছে, সেগুলো পরিশোধের ব্যবস্থা করে তবেই বাদ দিতে হবে। এসব ব্যর্থ বিমা কোম্পানির টাকাপয়সা কোথায় কীভাবে আছে, তাদের কী কী সম্পত্তি রয়েছে ইত্যাদি খুঁজে বের করতে হবে। এগুলো বিক্রি করে দিয়ে জনগণের দায় পরিশোধ করতে হবে।
আসলে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে ব্যাংক কোম্পানি খুলে জনগণের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহের যে সমস্যা, ঠিক একই সমস্যা বিমা কোম্পানির ক্ষেত্রেও। প্রশাসনকে ম্যানেজ করে অনুমোদন নিয়ে একটা রুম ভাড়া করে বিমা কোম্পানির সাইনবোর্ড টাঙালেই হয়ে গেল বিমা কোম্পানি! এ প্রক্রিয়া শুধু ঢাকা শহরেই নয়, মফস্বল পর্যন্ত চলে গেছে এর বিস্তৃতি। শুধু তাই নয়, মফস্বলের বড় হাটগুলোয়ও এসব তথাকথিত বিমা এজেন্সির কার্যক্রম চলছে। এসব এজেন্ট নামধারীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নানাবিধ লোভনীয় কাহিনি শোনায় জনগণকে। যেমন: আপনি মরে গেলে আপনার পরিবার কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, পরিবারের কর্তা পঙ্গু হয়ে গেলে সংসার কীভাবে চলবে ইত্যাদি। এরপর বিভিন্ন চটকদার বোনাস পাওয়ারও কথা বলে জনগণকে প্রলুব্ধ করে। যদিও তাদের এ বোনাসের হিসাবে অনেক গরমিল রয়েছে। তারপর দেখা যায়, বিমাকারীর মেয়াদপূর্তির পর যে দুই লাখ টাকা জমা হয়েছে, তার সঙ্গে খুব সামান্যই যোগ করা হয়। এর মধ্যে ৮-১০ বছর চলে গেছে। মূল্যস্ফীতিতে এ টাকার মূল্যমান হয়ে যায় অর্ধেকেরও কম। আর এভাবেই জনগণের কাছে আস্থা হারাচ্ছে দেশের বিমাশিল্প।
বিমা খাতকে এ সংকট থেকে বের করতে হলে শক্ত অবস্থানে যেতে হবে নিয়ন্ত্রণ সংস্থাকে। আসলে বিমা খাতে পেশাদারির যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। বিমার একটা মহৎ উদ্দেশ্য ছিল। এ মহৎ উদ্দেশ্যটি বিমাশিল্পে পালিত হচ্ছে না বলেই প্রতীয়মান। আরেকটি বিষয় রয়েছে বিমাশিল্পে। বিমার দায়-দেনার হিসাব, বিমার প্রিমিয়াম বা কিস্তির হিসাব-এগুলো পরিচালনা বা তদারকির জন্য বিশেষ বিষয় আছে, যাকে একচুয়ারি বলা হয়। এই একচুয়ারি সম্পর্কে বিমা কোম্পানির অনেকেই জানে না। বাংলাদেশে কজন একচুয়ারি আছে, তাও কেউ জানে না। অথচ তারা বিমা কোম্পানি দিয়ে বসে আছে!
পুঁজিবাজারে বিমা কোম্পানির শেয়ারগুলো নিয়েও চলে ভেলকিবাজি। আমাদের পুঁজিবাজার বা শেয়ারবাজারে কতিপয় জুয়ারি আছে, যারা শেয়ার নিয়ে খেলতে থাকে। কিছু শেয়ার, যেগুলোর পেইড-আপ ক্যাপিটাল কম, এরা সেগুলোকে উপরে তুলে নিজেরা ফায়দা লুটে। একেকটা বিমা কোম্পানির প্রতিটি শেয়ারের দাম যেখানে ৩০ টাকা, কয়েক সপ্তাহ পর তা দেখায় ১২০ টাকা। এগুলো নিয়ে ‘প্লে অ্যারাউন্ড’ করে। এর মূল কারণ হচ্ছে, তাদের পেইড-আপ ক্যাপিটাল কম। সবকিছু মিলিয়ে আমাদের অর্থনীতিতে এটা হচ্ছে একটা দুষ্ট ক্ষত। এ দুষ্ট ক্ষত থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
বিমা সম্পর্কে মানুষের কিছু ভুল ধারণাও রয়েছ। তাছাড়া এজেন্টদের অতিরিক্ত প্রচারণা, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, বিমার দায় পরিশোধে ব্যর্থতা ইত্যাদি কারণে বিমার প্রতি মানুষ বিরক্ত হয়ে গেছে। আরেকটি বিষয় না বললেই নয়, তা হলো গ্রুপ ইন্সুরেন্স। চাকরির ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলকভাবে গ্রুপ ইন্স্যুরেন্স করানো হয়। কিন্তু এ গ্রুপ ইন্স্যুরেন্সের টাকা কেউ পায় না। যদিও পায়, তা যৎসামান্য, যা নিয়ে কারও কোনো লাভ হয় না। আমি জানি না গ্রুপ ইন্স্যুরেন্স কেন করা হয়। যেটা থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কোনো সুবিধা পাবে না, তা করে লাভ কী? আসলে যারা বিমার মালিক, যাদের সততা রয়েছে, তাদের একটু এগিয়ে আসা উচিত। তাদের ব্যাখ্যা করা উচিত বিষয়টি কীভাবে হওয়া দরকার। বিমাশিল্পের কমিশনভিত্তিক তথাকথিত এজেন্ট ব্যবস্থাকে উঠিয়ে দেওয়া উচিত। দু-একটি বিমা কোম্পানি ব্যাংকের ওপর প্রিমিয়াম সংগ্রহের দায়িত্ব দিয়েছে। এটা বিমাশিল্পের জন্য খুবই আশাব্যঞ্জক। কিন্তু অধিকাংশ বিমা কোম্পানি এখনো এ দায়িত্বটি ব্যক্তি পর্যায়েই দিয়ে রেখেছে। ফলে প্রিমিয়ামের বেশির ভাগ টাকাই চলে যায় এজেন্টদের হাতে। ব্যাংক তো এজেন্টদের মতো করবে না। ব্যাংক সামান্য কমিশনেই কাজটি করে দেয়। এটাই নিয়ম। বিমার প্রিমিয়ামের বিষয়টি ব্যাংকের মাধ্যমেই হওয়া উচিত। এতে মধ্যস্থভোগীরা ফায়দা নিতে পারবে না। আসলে বিমা কোম্পানি বলি আর ব্যাংক কোম্পানি, কোনোটিতেই মানুষের আস্থা নেই। মানুষ শান্তিতে কোথাও বিনিয়োগ করবে, তার এখন বড় অভাব। সত্যি কথা বলতে কী, মানুষের মনে শান্তি নেই। কোন দিকে যাবে মানুষ, সবখানে প্রতারক-প্রবঞ্চকে ভরে গেছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বীমা খাত
- বিমা কোম্পানি