প্রশান্ত কিশোরের জয় কি ভারতে তৃতীয় ধারার রাজনীতির ইঙ্গিত
সন্দেহাতীতভাবে ভারতের এক নম্বর রাজনীতি ও ভোটকুশলী প্রশান্ত কিশোরের ‘জন সূরাজ’ দলের পূর্ব ভারতের বিহার রাজ্যের বাঁকিপুর জয় (যে আসন ১৯৯৫ সাল থেকে বিজেপির দখলে ছিল) কেবল একটি উপনির্বাচনে জয় নয়; এটি সম্ভবত একটি ‘নতুন রাজনীতি’কে সংগঠিত করার ইঙ্গিত।
এমন এক সময়ে এই জয় এল, যার মাত্র কয়েক মাস আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরে বিহার বিধানসভা নির্বাচনে কিশোরের দল একটি আসনও পায়নি। বেশির ভাগ প্রার্থীর জামানতও বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। কিন্তু কিশোর হাল ছাড়েননি। তিনি বিহারেই থেকে গেছেন, সংগঠন গুছিয়েছেন, আর দাবি করেছেন, বাঁকিপুর জয় কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।
গত সপ্তাহে মাত্র একটি বিধানসভা আসনে জিতেই তিনি এখন বিহারের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক মুখ হয়ে উঠেছেন। এতে বোঝা যায়, রাজ্যের রাজনীতিতে একটা বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এই শূন্যতা লালু-নীতীশ-বিজেপির পুরোনো ত্রিভুজ আর ঠিকভাবে পূরণ করতে পারছে না।
এই জয়-পরাজয়ের আগে প্রশান্ত কিশোরকে ঘিরে যে গল্পটা তৈরি হয়েছিল, সেটা ছিল একজন সফল নির্বাচনী কৌশলবিদ থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠার গল্প। তিনি ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির নির্বাচনী প্রচার সামলেছিলেন। এরপর একে একে নীতীশ কুমার, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অন্ধ্র প্রদেশের জগনমোহন রেড্ডির সঙ্গেও কাজ করেন। তারপর ২০২২ সালে ‘জন সূরাজ’ পদযাত্রা শুরু করে নিজের রাজনৈতিক দল গড়ার পথে নামেন।
তবে এই পুরো গল্প বা বয়ানটা নভেম্বরেই অনেকটা ভেঙে পড়েছিল।
প্রশ্ন উঠেছিল, ভোটকুশলীর কৌশল আর নিজের রাজনীতি করার মধ্যে যে ফারাক, তা কিশোর আদৌ পার হতে পেরেছেন কি না। এখন মানতেই হচ্ছে, তিনি তা পেরেছেন। অন্তত আপাতত পেরেছেন। কিশোরের এই জয় অবশ্য ভারতের রাজনীতিতে বড় একটি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তা হলো: কিশোর কি বড় কোনো রাজনৈতিক সমীকরণের অংশ, যার মধ্যে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি (আপ) এবং তামিলনাড়ুর অভিনেতা বিজয়ের টিভিকেও রয়েছে?
কিশোর, কেজরিওয়াল, বিজয়—এই তিনজনের ক্ষেত্রে সাদৃশ্যটি স্পষ্ট, অন্তত প্রচারের স্তরে। তিনজনই শাসনব্যবস্থাকে একটি পণ্য হিসেবে তুলে ধরছেন। ভারতীয় রাজনীতির ভিত্তি হিসেবে শ্রেণি, জাতি, সম্প্রদায় ও ধর্মকে দীর্ঘদিন থেকে বিবেচনা করা হলেও তাঁরা এগুলোকে যতটা সম্ভব এড়িয়ে যেতে চান।
কেজরিওয়াল তাঁর রাজনৈতিক ব্র্যান্ড গড়েছিলেন বিনামূল্যে বিদ্যুৎ, পানি ও মহল্লা (পাড়ার) ক্লিনিকের ওপরে। এটি এমন এক রাজনীতি, যেখানে নাগরিক শুধু ভোটার নয়, গ্রাহকও। কিশোরের রাজনীতি সব সময়ই করপোরেট কর্মদক্ষতার আশ্বাস। তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় অন্যতম স্লোগান ছিল, ‘অর্শ পর ইয়া ফর্শ পর’ (‘হয় আপনি সিংহাসনে থাকবেন, না হয় মাটিতে’)। অর্থাৎ কিশোর জিতলে ভোটার অনেক কিছু পাবেন। যেমন ঋণ মকুব করা হবে, পেনশন ও শিক্ষা বিস্তৃত হবে, রোজগারকেন্দ্রিক দাবিদাওয়া পূরণ হবে।
যদিও কীভাবে সেসব হবে, তা নিয়ে তেমন বিস্তারিত কিছু তিনি বলেনি। আর বিজয় প্রচার চালিয়েছেন, পরিচ্ছন্ন প্রশাসন ও তরুণদের চাকরির প্রতিশ্রুতি নিয়ে। সেই প্রচার–প্রচারণায় সামাজিক ও জাতিগত রাজনীতির প্রতিশ্রুতি দ্রাবিড় প্রতীকবাদের মধ্যে আছে বটে, কিন্তু তার পুরোনো আদর্শগত ভিত্তি নেই।
পুরোনো বিভাজনরেখাকে তাঁদের কেউই মূল রাজনৈতিক হাতিয়ার বানাননি। কে জমির মালিক, কার হাতে পুঁজি, মন্দির বা কোন সমাজের মানুষকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্রাত্য রাখা হয়—এ প্রশ্নগুলো তাঁদের রাজনীতির কেন্দ্রে নেই। থাকলেও একেবারে না থাকার মতো করে হয়তো আছে। জাতি ও সাম্প্রদায়িকতাকে তাঁরা দেখছেন সেকালের অবশেষ হিসেবে, বর্তমানের জীবন্ত কোনো কাঠামো হিসেবে নয়। বদলে যা তাঁরা বহন করে নিয়ে চলেছেন, তা হলো একধরনের প্রতিযোগিতামূলক জনমনোরঞ্জক কল্যাণবাদ। এ যেন কে বেশি প্রতিশ্রুতি দিতে পারে তার দৌড়। অথচ কে সেই খরচ বহন করবে বা ঐতিহাসিকভাবে কে সেই খরচ বহন করে এসেছে, সে প্রশ্ন তাঁরা সবাই এড়িয়ে গিয়েছেন বা যাচ্ছেন।
- ট্যাগ:
- মতামত
- ভারতের রাজনীতি