বাংলাদেশ বিমান কত ‘কুখ্যাত’ ৫০ বছর আগেই বলেছিলেন হুমায়ুন আজাদ

বিডি নিউজ ২৪ রাজু আলাউদ্দিন প্রকাশিত: ১১ আগস্ট ২০২৬, ২২:২৫

“১৯৭৬-এর সেপ্টেম্বরে আমি দেশে ফিরি, ফেরাটা ছিল বিভীষিকাপূর্ণ। তখন বাংলাদেশ বিমান নতুন হয়েছে, সরকার ঠিক করেছে বাংলাদেশের ছাত্রদের বাংলাদেশ বিমানে দেশে ফিরতে হবে। আমি কমনওয়েলথ বৃত্তি পেয়েছিলাম, ফেরার কথা ছিল ব্রিটিশ বিমানে, কিন্তু আমি ফিরতে বাধ্য হই বিভীষিকাপূর্ণ বাংলাদেশ বিমানে। বাংলাদেশ বিমান সব দিক দিয়েই কুখ্যাত; তার যন্ত্রপাতি খারাপ, আসন খারাপ, খাদ্য ও পানীয় প্রায় দেয়ই না, সেবক-সেবিকারা আদর্শ রূপে অভদ্র। বিমানের প্রতিচ্ছবিটিও আমার অপছন্দ, ওটিকে দেখলে আমার ক্লান্ত শকুনকে মনে পড়ে। বাংলাদেশ বিমান হচ্ছে আকাশে নোংরা বস্তি। …সময় কেটে যাচ্ছিল, বিমান উড়ছিল না; পল্লিগীতি ও বঙ্গীয় গোলমালে বিমানটা সদরঘাট হয়ে উঠেছে তখন। ঘণ্টাখানেক পর ঘোষণা করা হলো আরও যাত্রী উঠবে, তাই উড়তে একটু সময় লাগবে। এভাবে দু-ঘণ্টা গেল, তারপর ঘোষণা করা হলো কিছু মালপত্র উঠতে বাকি। আমরা বিমানের মধ্যে তিন ঘণ্টা কাটিয়েছি, মালপত্র নাকি তখনও উঠছে। চার-পাঁচ ঘণ্টা কেটে গেলে দেখা গেল ‘সোনার ময়না পাখি’ ও ‘ও কি গাড়িয়াল ভাই’ বন্ধ হয়ে গেছে, শুরু হয়ে গেছে কোরান পাঠ। বিমানের প্লেয়ারে শুরু হলো কোরান পড়া, ভয় ছড়িয়ে পড়তে লাগল বিমানভরে। এভাবে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা কাটার পর ঘোষণা করা হলো যে বিমানে যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দিয়েছে, হল্যান্ড থেকে ইঞ্জিনিয়াররা আসবে, ঠিকঠাক করবে, তারপর বিমান আল্লাহর নাম নিয়ে আকাশে উড়বে। শুনে খুব সুখ লাগল। আমাদের বসে থাকতে হবে বিমানেই, বাইরে যেতে পারব না। দেখে আমি অবাক হলাম যে সবার সঙ্গেই একটি ছোট কোরান আছে, বিমানে হয়তো কোরানই ভরসা। সবাই তখন কোরান পড়তে শুরু করেছে, বিমানের ক্যাসেটে কোরান বাজছে। আমি চুপ করে বসে আছি। এভাবে তিন-চারটা ঘণ্টা কাটার পর জানানো হলো যান্ত্রিক গোলযোগ দূর হয়েছে, কিছুক্ষণের মধ্যে বিমান আকাশে উড়বে। সম্ভবত দুর্বিষহ এগারো ঘণ্টার পর বিমান আকাশে ওড়ে।” (হুমায়ুন আজাদের একগুচ্ছ সাক্ষাৎকার, মোহাম্মদ আলী, নন্দিত, বইমেলা ২০১৪, পৃ. ২৭-২৮।)


যে দীর্ঘ উদ্ধৃতি দেওয়া হলো, তা আজ থেকে ৫০ বছর আগে এমন এক যাত্রীর অভিজ্ঞতা—যিনি বাংলা সাহিত্যের একজন বিখ্যাত লেখক। যিনি সত্য কথা স্পষ্টভাবে বলার জন্য কিছুসংখ্যক মানুষের কাছে নিন্দিত হয়েছিলেন, কিন্তু বেশির ভাগ পাঠকের কাছেই তিনি ঠিক ওই একই কারণে ছিলেন নন্দিত। তিনি হুমায়ুন আজাদ। ওই সাক্ষাৎকারে হুমায়ুন আজাদ আরও বলেছিলেন, “আমি তখনই ঠিক করেছিলাম আর কখনো বিমানে উঠব না;… বাংলাদেশ বিমান আমার মনের মধ্যে যে বিভীষিকা সৃষ্টি করেছিল, তাকে ওরা বলে ‘ফিয়ার অব ফ্লাইং’, ওড়ার ভয়; তা আমার ছিল না, তবে বাংলাদেশ বিমান এটা আমাকে উপহার দেয়।”


আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, ৫০ বছর পর একই ঘটনা ঘটেছে; বলা উচিত, আরও বেশি বিভীষিকাপূর্ণভাবে ঘটেছে গত বৃহস্পতিবার থেকে রোববার পর্যন্ত। এবং তিনি যা বলেছিলেন, তারই প্রতিধ্বনিত হতে দেখা গেছে ১৭০ জন যাত্রীর কণ্ঠে। যাত্রীসংখ্যা যদিও আরও বেশি ছিল, কিন্তু তারা ছিলেন বিদেশি পাসপোর্টধারী; ফলে তাদের ওই ১৭০ জন যাত্রীর মতো অতটা দুর্ভোগ পোহাতে হয়নি। ১৭০ জনকেই কেন অতটা দুর্ভোগ পোহাতে হলো? কারণ তারা বাংলাদেশি, ফলে অপাঙ্ক্তেয়, অতএব অবহেলাযোগ্য। এবং দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, এই অবহেলা করা হয়েছে বাংলাদেশিদের দ্বারাই। ফিউমিচিনো টার্মিনালে অস্বাভাবিক রকমের দীর্ঘ সময় দুঃসহ অপেক্ষায় কেউ অসুস্থ হয়ে মারা গেলেও বোধহয় তাদের কিছু আসত যেত না। বাংলাদেশি যাত্রীদেরকে তারা মানুষ ভাবে বলে মনে হয় না।


বাংলাদেশি যাত্রীদের সঙ্গে বাংলাদেশ বিমানের দুর্ব্যবহার নতুন নয়। এটি তাদের ‘সিগনেচার বিহেভিয়ার’ হিসেবে পরিচিত। পৃথিবীর আর কোনো এয়ারলাইনস সম্পর্কে এত বদনাম নেই। তারা শুধু যাত্রীদের সঙ্গেই দুর্ব্যবহার করে না; তাদের কুখ্যাতি আছে শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে সাধারণ কর্মীদের মধ্যে দুর্নীতি, লুটপাট, অনিয়ম ও অদক্ষতার। এবং তা একটি-দুটি নয়, কিংবা একবার-দুবার নয়; বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে। উড়োজাহাজ লিজ নেওয়া থেকে শুরু করে নিয়োগ ও পদোন্নতির বাণিজ্য, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং কেনাকাটায় অনিয়মের অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিরুদ্ধে। ২০১৪ সালে মিশরীয় বিমান লিজ নেওয়ার কেলেঙ্কারির কথা সবাই জানেন। শোভন ভাষায় ‘আর্থিক অনিয়ম’ শব্দ ব্যবহার করলেও এ ছিল মূলত পরিকল্পিত এক দুর্নীতি, আর এর ফলে সরকারের ক্ষতি হয়েছে ১,১৬১ কোটি টাকার বেশি। এই কিছুদিন আগেই সরকারি অর্থে সফটওয়্যার কেনায় প্রায় ৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বিভাগীয় মামলার মুখে পড়েছিলেন মিজানুর রশীদ। শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রায়ই ক্ষমতার অপব্যবহার, ভুয়া টেকনিক্যাল ভাতা প্রদান এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো লঙ্ঘন করে বেতন-ভাতা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। স্বাধীনতার পর যতগুলো সরকার এসেছে, তারা প্রত্যেকেই এদের দুর্নীতির কথা জানে; শুধু জানেই না, কখনো কখনো তাদেরকেই পদোন্নতি দিয়ে পুরস্কৃতও করেছে। সফটওয়্যার কেনায় অনিয়ম যার বিরুদ্ধে, সেই মিজানুর রশীদকেই “গত ৪ মার্চ তাকে বদলি করা হয় অর্থ ও হিসাব বিভাগে। তার এক দিন পর তাকে প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক হিসেবে বদলি করা হয়। একই সঙ্গে তাকে প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগের পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি অর্থ বিভাগের পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্বও দেওয়া হয় তাকে। পরিচালকের পদটি মহাব্যবস্থাপকের চেয়ে উঁচু।” (প্রথম আলো, ১৫ মার্চ ২০২৬)


এটি এমন এক প্রতিষ্ঠান, যার দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা বিশ্বের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বিমানের এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং দুর্নীতির কারণে এর যাত্রীসেবার মান দিন দিন কমছে। গত বৃহস্পতিবার থেকে রোববার পর্যন্ত টরন্টোর পিয়ারসন বিমানবন্দর থেকে আড়াই শর বেশি যাত্রী নিয়ে রোমের ফিউমিচিনো হয়ে ৪০ ঘণ্টা পর ঢাকায় পৌঁছানো ১৭০ জন বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীর সঙ্গে যে নির্মম আচরণ করা হয়েছে, তা বিমানের যাত্রীসেবার ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল। যাত্রীদের অনেকেই ছিলেন বয়স্ক মানুষ, শিশু এবং নারী। উড়োজাহাজে যান্ত্রিক ত্রুটি হতেই পারে, সেজন্য ২৪ ঘণ্টার পথ ৪০ ঘণ্টায় গড়াতে পারে; কিন্তু যাত্রীদের সবাইকে সমান সেবা দিয়ে তাদের প্রয়োজনীয় খাবার এবং হোটেলে থাকার সুবিধা দেওয়া উচিত ছিল। বিমান সেই সেবা কেবল বিদেশি পাসপোর্টধারী কানাডিয়ান ও মার্কিন নাগরিকদের দিলেও, বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী কাউকেই তা দেয়নি। “১৭০ জন যাত্রীকেই ৪০ ঘণ্টা সময়ের পুরোটাই বিমানবন্দরের ‘প্রিমা ভিস্তা’ লাউঞ্জে বসে কাটাতে হয়েছে।” (৯ অগাস্ট ২০২৬, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

এই সম্পর্কিত

আরও