জামায়াতের আমির ঠিক বলেননি...
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান আল–জাজিরার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, কখনো একজন নারী তাঁর দলের প্রধান হতে পারবেন না। কেন? কারণ, নারী ও পুরুষ সমান নন। তাঁদের যাঁর যাঁর ভূমিকা আলাদা। নারীরা সন্তানের জন্ম দেন, পুরুষেরা তা পারেন না। সৃষ্টিকর্তাই এ নিয়ম বেঁধে দিয়েছেন। এর আগে এই দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কোনো নারীকে সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তারা সমর্থন করে না।
এ কথা ভেঙে দেখলে মোদ্দা অর্থ যা দাঁড়ায়, তা হলো নারী পুরুষের সমকক্ষ নন। পুরুষ যা পারেন, নারী তা পারেন না। পুরুষ হবেন দলের, দেশের নেতা। অন্যদিকে নারীরা সবচেয়ে ভালো পারেন সন্তানের জন্ম ও তাদের লালন-পালন করতে। অতএব তাঁদের ঘরে আটকে রাখো, সেটাই তাঁদের প্রকৃষ্ট স্থান। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতসহ অন্তত ৩০টি দল যে ৩০০ আসনের ১টিতেও একজন নারী প্রার্থী দেয়নি, তা থেকেই স্পষ্ট—তাদের চোখে এই নারী-পুরুষের ফারাক কতটা গভীর।
এই মনোভাব যখন রাষ্ট্রীয় বা সরকারি নীতিতে দাঁড়ায়, তার ফল কেমন হয়, তার একটি ভালো ছবি দেখতে পাই আজকের আফগানিস্তানে। সেখানে বিধাতার নিয়মের অজুহাতে মেয়েদের ১২ বছরের পর স্কুলের দরজা বন্ধ করা হয়েছে। অতি সামান্য দু-একটি ক্ষেত্র ছাড়া কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রাস্তায় একা চলা বন্ধ করা হয়েছে। এমনকি জোরে কথা বলাও শান্তিযোগ্য অপরাধ বলে নির্ধারিত হয়েছে।
বাংলাদেশে, যেখানে তার ইতিহাসের একটা বড় সময় ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেছেন দুটি দলের প্রধান দুই নারী, সেখানে নারী দলীয় প্রধান বা সরকারপ্রধান হতে পারবেন না, এ কথা শুধু হাস্যকরই নয়; খুবই সেকেলে। এই দুই নারী প্রধান শুধু দাপিয়ে দেশ শাসন করেছেন, তা–ই নয়। অনেক পুরুষ সহকর্মীরা তাঁদের সঙ্গে কথা বলার আগে ‘স্যার’ যোগ করে সম্ভাষণ করতেন।
একসময় নারী পুরুষের সমকক্ষ ছিল না, অনেক ক্ষেত্রে এখনো নয়। তার কারণ মেয়েদের সমকক্ষ হতে দেওয়া হয় না। শাসন ও অনুশাসন দুটোই পুরুষদের হাতে। অবস্থাটা একদম বদলে যায়, যদি মেয়েদের ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ দেওয়া হয়। অথবা যদি পুরুষের সঙ্গে সমানতালে প্রতিযোগিতার পথটা কিছুটা সমতল করা হয়। সে সুযোগ পেয়েছে বলেই বাংলাদেশের মেয়েরা এখন ফুটবলে শিরোপা জিতছে। হিমালয়ের শৃঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা বহন করছে। দেশের নারী পুলিশ সদস্যরা হাইতির মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে যোগ্যতার সঙ্গে শান্তি রক্ষার দায়িত্ব পালন করেছেন।
মেয়েদের সামনে অনেক বাধা, অনেক দেয়াল। সে দেয়াল ভেঙে বাইরে বেরোতে পারলে মেয়েরা কেমন ফল দেখাতে পারেন, তার এক চমৎকার উদাহরণ শিক্ষাক্ষেত্রে মেয়েদের সাফল্য। বাংলাদেশে ছেলেদের তুলনায় এখন অধিক সংখ্যায় মেয়েরা শিক্ষার সুযোগ গ্রহণ করছেন। ২০২৪ সালের হিসাবে প্রাথমিক পর্যায়ে ছেলেদের ভর্তির হার যেখানে ছিল ৯০ শতাংশ, সেখানে মেয়েদের ৯৮ শতাংশ।
সাম্প্রতিক সময়ে হাইস্কুল পর্যায়ে প্রতিটি শীর্ষ পরীক্ষার ফলাফলে মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে গেছে। ২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় মেয়েদের পাসের হার ছেলেদের চেয়ে ৮ শতাংশ বেশি—৬২ শতাংশ বনাম ৫৪ শতাংশ। এর পরবর্তী ধাপে বিশ্ববিদ্যালয়ে পারিবারিক-সামাজিক বাধার কারণে মেয়েরা সমানতালে এগোতে পারেন না, কিন্তু যেসব দেশে সেই বাধা তুলনামূলকভাবে কম, সেখানে মেয়েরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পর্যায়ে ছেলেদের চেয়ে অনেক ভালো করছেন। যেমন যুক্তরাজ্যে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুসারে, বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট পর্যায়ে যুক্তরাজ্যে পুরুষদের পাসের হার যেখানে ৮১ শতাংশ, সেখানে মেয়েদের হার ৮৬ শতাংশ। ১৯ বছর বয়সী এমন মেয়েদের ৫৬ শতাংশ যেখানে কলেজে প্রবেশে করছেন, সেখানে একই বয়সী ছেলেদের সংখ্যা মাত্র ৪০ শতাংশ।
মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের পিছিয়ে পড়া এতটা ভীতিকর হয়ে উঠেছে যে যুক্তরাজ্যের হায়ার এডুকেশন অ্যান্ড পলিসি ইনস্টিটিউট প্রস্তাব রেখেছে, ছেলেদের এগিয়ে নিতে সাহায্য করতে নতুন রণকৌশল প্রণয়নের পাশাপাশি একজন জুনিয়র মন্ত্রীকে নিয়োগ দেওয়া হোক। ডানপন্থী রাজনীতিক নাইজেল ফারাজ ‘মিনিস্টার ফর বয়েজ’ এই নামে একটি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব পর্যন্ত করেছেন।
বস্তুত আধুনিক বিজ্ঞান এ কথা প্রমাণ করেছে যে মেয়েরা পুরুষের তুলনায় কোনো ক্ষেত্রেই অধম নয়, বরং উল্টো। বুদ্ধিমত্তা সূচক বা আইকিউর ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সমান হলেও মেয়েদের পক্ষে একই সঙ্গে সফলভাবে একাধিক কাজ করা সম্ভব (মাল্টিটাস্কিং)। একইভাবে মেয়েদের স্মৃতি ধারণক্ষমতা বেশি। কারণ, মেয়েদের মস্তিষ্কে বাঁ ও ডান অর্ধগোলকের মধ্যে যোগাযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর।