জুলাইয়ের স্বপ্ন, হাদি হত্যাকাণ্ড ও অমীমাংসিত সহিংসতা
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অভিঘাতে বাংলাদেশের রাজনীতি যে নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছিল, তার পূর্ণ পরিণতি এখনো নির্ধারিত হয়নি। সেই অস্থির সময় পেরিয়ে দেশ শেষ পর্যন্ত দেড় দশকেরও বেশি পর একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন সরকার পেয়েছে, সরকার গঠন করেছে বিএনপি। কিন্তু নির্বাচন যেমন নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে, তেমনি রেখে গেছে বহু অমীমাংসিত প্রশ্ন। গণঅভ্যুত্থানের আবেগ, রাজনৈতিক সহিংসতার দাগ এবং একটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের ছায়া—সব মিলিয়ে নতুন সরকারের সামনে এখন বড় একটি দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করে ন্যায়বিচারের পথে ফেরানো।
জুলাইয়ের আন্দোলন শুরু হয়েছিল চাকরিতে কোটাপ্রথা বাতিলের দাবিতে। পরে আন্দোলনে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কারের দাবিও যুক্ত হয় এবং ছাত্রদের সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। শিক্ষার্থী, শ্রমিক, পেশাজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং দীর্ঘদিন রাজনীতি থেকে দূরে থাকা সাধারণ নাগরিকও রাজপথে নেমেছিলেন এবং শেষপর্যন্ত তা শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়। সফল ওই আন্দোলনের একটি উল্লেখযোগ্য কণ্ঠ ছিলেন শরীফ ওসমান বিন হাদি, যিনি অভ্যুত্থানের পরে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক হিসেবে দ্রুত পরিচিত হয়ে উঠেন। টেলিভিশনের পর্দায় তার বক্তব্য, ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে তার অবস্থান এবং নির্বাচনি রাজনীতিতে সক্রিয় উপস্থিতি তাকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
ওসমান হাদি প্রায়শই অমার্জিত ভাষায় কথা বলতেন। রাজনীতির প্রয়োজনে তিনি কখনো প্রতিপক্ষকে ভড়কে দিতে চাইতেন, আবার কখনো নিজেই অনেক বড় ঝুঁকি নিতেন। তার এই নির্ভীকতা মানুষের প্রশংসা কুড়ালেও মাঝেমধ্যে তা শালীনতার মাত্রা ছাড়িয়ে যেত। তবে এই কঠোর ও লড়াকু মেজাজের কারণেই জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে নিজেকে রাজনীতির একজন মুখ্য চরিত্রে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন এবং ঢাকা-৮ আসনে নির্বাচন করবেন বলে গণসংযোগেও নেমে পড়েছিলেন।
রাজনৈতিক উত্তেজনার সেই সময়েই ঘটে যায় এক নির্মম ঘটনা। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন ঢাকায় সশস্ত্র হামলার শিকার হন হাদি। পরে বিদেশে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু সংবাদ আসে, যা দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। রাজধানীর রাজপথ উত্তাল হয়ে ওঠে। প্রতিবাদ, বিক্ষোভ এবং ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে নানা স্থানে। এই হত্যাকাণ্ড শুধু একটি রাজনীতিকের মৃত্যু ছিল না; জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার এক ভয়ংকর প্রতিফলন হয়ে ওঠে।
এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে পড়ে। সে সময় দেশের দুটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র ‘প্রথম আলো’ ও ‘ডেইলি’ ছাড়াও সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ছায়ানট’ ও ‘উদীচী’ কার্যালয়ে ন্যাক্কারজনক হামলার ঘটনা ঘটে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই অনেক মাজার ভাঙা হয়েছে, কবর থেকে লাশ তুলে এনে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে, ধর্ম অবমাননার অভিযোগে এক পোশাকশ্রমিককে কারখানা থেকে তুলে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা ও তার মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাটি ছিল জনমনে চরম আতঙ্কের কারণ। হাদি নিহত হওয়ার পর এই সব মবের পেছনে ইন্ধনদাতাদের পরিচয় কিছুটা প্রকাশ্য হয়েছে। প্রশাসনের ভেতরে থেকে যারা এর আগে মবকে ‘প্রেশার গ্রুপ’ হিসেবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, তারাও একপর্যায়ে নিন্দায় সরব হতে বাধ্য হন।
অনেকেই দাবি করেন, হাদি হত্যাকাণ্ডের পেছনে বৃহত্তর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে। এমনকি কেউ কেউ অভিযোগ করেন যে এর মাধ্যমে নির্বাচনকে অনিশ্চিত করে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। এর ফলে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার তীব্র চাপের মুখে পড়ে। দেশজুড়ে সন্দেহ, আতঙ্ক এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে থাকে। নির্বাচন আদৌ হবে কি না, তা নিয়েও সংশয় দেখা দেয়। শেষপর্যন্ত সুষ্ঠু একটা নির্বাচন হলেও হাদি হত্যার তদন্ত অগ্রসর হয়নি। তবে সম্প্রতি এই ঘটনা নাটকীয় মোড় নিয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয় যে হত্যাকাণ্ডের প্রধান সন্দেহভাজন ফয়সাল করিম মাসুদ এবং তার সহযোগী আলমগীর হোসেনকে পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জানা যায়, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাদের অবস্থান শনাক্ত করে। দুই দেশের মধ্যে তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে এই গ্রেপ্তার সম্ভব হয়েছে বলা হচ্ছে।