খালকাটা কর্মসূচি: ‘কৃষকেরা যদি পেছনে থাকে, তুমি এগিয়ে যাবে’
চণ্ডীজন নদী। কুড়িগ্রাম থেকে চিলমারী যাওয়ার পথে দুর্গাপুর বাজার পেরিয়ে নদীটি। তিস্তা কি ধরলা থেকে এসে রেললাইন ও কেসি রোড পার হয়ে ব্রহ্মপুত্রে পড়েছে। এলাকাটির নামও নদীর নামেই।
গণকমিটির আন্দোলনের ফলে ৩ বছর আগে নদীটি খনন করা হয়। তারপর খননকৃত নদীর মাটি ফেলা হয় নদীর তীরেই। ফলাফল হয়, নদীটি আরও সরু হয়ে তিন ভাগের এক ভাগে নেমে আসে এবং বন্যার জৈব কাদাপানি মাছসহ যেমন উপচে প্লাবনভূমিতে পৌঁছাতে পারে না, তেমনি বৃষ্টির পানিও নদীতে ফিরে আসতে পারে না এবং তীরের মাটি আবার বৃষ্টিতে ধুয়ে নদীকে ভরাট করে তোলে। ফলে খালের বহুমাত্রিক উপকারিতা শুধু একটি–দুটিতে এসে ঠেকে।
অথচ ব্রিটিশপূর্ব আমলে খাল কাটার পর প্রকৌশলীরা পানির দায়িত্ব তুলে দিত আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর ওপর। আঞ্চলিক সংস্থাগুলো কাজ করত কৃষকদের মাধ্যমে এবং তাদের দায়িত্ব ছিল পানি যাতে সব জমিতে পৌঁছায়, সেটা নিশ্চিত করা।
যে পথে পানি সবচেয়ে কম বাধা পায়, সে পথেই গড়ায়। ফলে তা কোনো জমিকে সিক্ত করত আবার কোনো জমিতে পৌঁছাতই না। এ রকম ধারায় চলে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল না। কারণ, মশাও পানির সঙ্গে সঙ্গে বিচরণ করে। এভাবে জমিও সমৃদ্ধ হতো না। কিন্তু সঠিকভাবে চালিত প্লাবন সেচব্যবস্থায় দুটি কাজই হতো।
এ পদ্ধতিতে চাহিদার থেকে বেশি হারে নদীর পানি পেত, কিন্তু প্রত্যেকের জমিতে পানি যাওয়ার ব্যবস্থা করার দায়িত্বও তাদের ছিল। জমি থেকে জমিতে এই পানি যাওয়ার বন্দোবস্ত এমন আন্তরিকতার সঙ্গে করা হতো এবং প্রত্যেকেই তাতে এমনভাবে জড়িয়ে যেত, যেন প্রতিবেশীর জমিটাও নিজেরই জমি (কেননা প্রতিবেশীর স্বার্থ থেকে নিজের স্বার্থ কেউ আলাদা করতে পারত না)। যেকোনো বিদ্যালয়ের চেয়েও চরিত্র বিকাশের উন্নত এক ক্ষেত্র ছিল এটা। কারণ, বাংলার প্রাচীন রাজাদের সামনে সমস্যা ছিল মাটিকে উর্বর করা, ম্যালেরিয়া ঠেকানো, মাছের বংশবিস্তার ও নদীর চাপ মোকাবিলা করা। ২০২৬–এ এসে যুক্ত হয়েছে ভূগর্ভস্থ পানির পরিস্থিতি ঠিক রাখা।
বলা হয়, ঐতিহাসিকভাবে পরস্পরের প্রতি ভালোবাসার যে প্রবণতা আমরা অর্জন করেছি, তা আকাশ থেকে পড়েনি। এটা এসেছে উপচানো খালগুলোর ঘোলা পানিবণ্টনের ব্যবস্থা থেকে। আবারও যদি এই প্লাবন সেচব্যবস্থা বহাল করা যায়, তাহলে আবার আমাদের অবস্থা তেমন উন্নত দশায় পৌঁছাবে।
অথচ খালকাটা কর্মসূচিতে জনগণের অংশগ্রহণই রাখা হয়নি। এক কিলোমিটার শুধু খননের শ্রম বাবদ ৫০ লাখ টাকা ধরলে ২০ হাজার কিলোমিটার এ খরচ হবে আনুমানিক ১ লাখ কোটি টাকা। আর জনগণকে যুক্ত করলে তিন গুণ খনন ও তীরে মাটি না ফেলেও সব খরচ শূন্যের ঘরে নামিয়ে আনা সম্ভব। কীভাবে?
সরকারি কর্তৃপক্ষ শুধু জনগণকে আহ্বান জানাবে, নিজ দায়িত্বে মাটি খুঁড়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আর দেখিয়ে দেবে কতটুকু মাটি খুঁড়ে নিতে হবে। এক ট্রলি মাটির দাম এখন চিলমারীতেই ১ হাজার ২০০ টাকা। দেখা যাবে, কে কত মাটি নিতে পারে, তার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। খালে পানি আসার আগেই মানুষ মাটি পেয়েই উপকৃত হচ্ছে। মাছের তেল থাকতে বাড়তি তেলে কেন মাছ ভাজবেন?
দুই.
বলা হয়, বাংলায় যদি কোনো ব্রিটিশের অবদান থেকে থাকে, তাঁর নাম তৎকালীন বাংলার জনস্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক ডা. বেন্টলি। তিনি তাঁর ম্যালেরিয়া অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার বইয়ে দেখিয়েছেন, কর্দমাক্ত বন্যার পানি দিয়ে সেচকাজ বাড়ানো আর ম্যালেরিয়ার প্রকোপ কমানো একই কথা। তিনি বলেছেন, নদীর পর্যাপ্ত পানিকে বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশিয়ে জৈব উপাদানে সমৃদ্ধ করে খাল-বিল-জলাশয়কে মাছে পূর্ণ করার চেয়ে মাছের বিস্তার ঘটিয়ে মশানিধন কম কঠিন ও সাশ্রয়ী।
কীভাবে কাদাপানি ম্যালেরিয়া তাড়ায়? নদীতে বন্যা শুরু হওয়ার সময়টাতেই মৌসুমী বৃষ্টিপাত শুরু হয়ে জমিতে বীজ বা ধানের চারা রোয়ার উপযোগী করে তোলে। বৃষ্টি যত বাড়তে থাকে শুষ্ক ও শস্যহীন জমি প্রথমে আর্দ্র হয়, তারপর পানিতে ঢেকে যেতে থাকে বিরাট ভূপৃষ্ঠ। কোটি কোটি মশার লার্ভা তখনই জন্মাতে থাকে। ঠিক সেই সময়টাতেই নদীর কাদা পানি প্রথমে নিয়ে আসে ভাল জাতের কার্প মাছের পোনা, তারপর আসে অন্য ছোটো মাছের জাতগুলো। সবার শেষে আসে চিংড়ি। ১৭ শতকে পর্যটক বার্নিয়ের যখন প্লাবনসেচ দেখেছিলেন, সেই পুরনো দিনে নদীর পাড় ছিল নীচু।
বন্যার পানি তখন খোলাখুলি চলে আসতো। খালের সঙ্গে নদীর সংযোগস্থলে কোনো পাড়ই থাকতো না। এ অবস্থায় মাছের ডিম ভেসে ভেসে খালে চলে আসতো। সেখান থেকে চলে যেতো খালের শাখা-প্রশাখা, ধানক্ষেত, পুকুর ও জলাধারে। মাছগুলো কিছুদিনেই তরুণ হয়ে উঠতো। সত্যিকার মাংসাষী ছিল এই মাছেরা। দ্রুতই তারা মশার লার্ভা খেয়ে শেষ করে ফেলতো। খালের ধারা আর পানির গতিপ্রবাহ মাছের ডিমকে সবজায়গায় ছড়িয়ে দিত এবং অল্প দিনের মধ্যেই খাল-বিল, পুকুর-জলাশয়, ধানক্ষেত-মাঠ সব ভরে যেত মাছে। যেখানেই মশার লার্ভা থাকুক না, তার শত্রু ছিল এসব মাছ।
বাংলার এই প্লাবনসেচ কেবল ম্যালেরিয়া বিতাড়নেরই হোতা ছিল না, এর কারণে বিপুল পরিমাণ মাছও সহজলভ্য ছিল। এই সেচ মাটিকে যেমন সমৃদ্ধ করতো তেমনি নদীতে বাড়তি পানির চাপ অসম্ভব করে তুলতো।
মহামারি জ্বরের প্রকোপ বিষয়ে ডা. ফ্রেঞ্চ যে প্রতিবেদন ব্রিটিশ সরকারের কাছে দিয়েছিলেন তাতে দেখা গেছে, ১৮৬২ থেকে ১৮৭২–এর মধ্যে বর্ধমানের মোট জনসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগই মরে গেছে। একই সময়ে একই রকম তথ্য দিয়েছেন লে. কর্নেল ক্যাম্পবেল। তিনি জানাচ্ছেন, মহামারি ছড়িয়ে পড়ার আগে হুগলি জেলার জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২ লাখ, গত ২০ বছরে জ্বরের প্রকোপে জনসংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে।
১৮৫৩ সালে হুগলি জেলার দামোদর নদীর মাথা একটি বাঁধ দিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ১৮৫৬ সালে স্রোতের তোড়ে তা ভেঙে যায় এবং তিনটি পুরোনো খালকে সেই স্রোত প্রাণবন্ত করে। ১৮৬৩ সালে আবার মাথাটি চূড়ান্তভাবে বন্ধ করা হয়। ১৮৭৫ সালে তিনটি রেগুলেটর বসিয়ে ওই তিন খালে পানি বইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। তারপর ১৯২৮ সালের দিকে অযত্নে খালগুলো পলিতে ভরাট হয়ে যায়। এ রকম নানা ঘটনায় দামোদর নদীর তলা উঁচু হয়ে ওঠে। এভাবেই বাংলার নিজস্ব সেচব্যবস্থার অন্তিমযাত্রা শুরু হয়।
১৮৬৯ সালের গণপূর্ত বিভাগের প্রকৌশলী অ্যাডলি বলেন, খননকৃত নদীগুলো বন্ধ করে দেওয়াই সব অশুভ ঘটনার জন্য দায়ী।