স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের সংসদ সদস্যপদ থাকা না থাকার তর্ক

বিডি নিউজ ২৪ আমীন আল রশীদ প্রকাশিত: ১৪ মার্চ ২০২৬, ২০:০৪

জাতীয় সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হওয়ায় দলের সব পদ ছেড়ে দিয়েছেন বিএনপি নেতা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম ও ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।


১২ মার্চ বিএনপির চেয়ারম্যানকে দেওয়া পদত্যাগপত্রে হাফিজ উদ্দিন আহমেদ লিখেছেন: “আজ ১২ মার্চ ২০২৬ তারিখে আমি বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হওয়ায় নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য বিএনপি জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ বিএনপির সকল পর্যায়ের পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলাম।”


একইভাবে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল তার পদত্যাগপত্রে লিখেছেন: “আজ ১২ মার্চ ২০২৬ তারিখে আমি বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হওয়ায় নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সম্পাদকসহ বিএনপির সকল পর্যায়ের পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলাম।”


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে ১২ মার্চ। এদিন বিএনপির সিনিয়র নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন হয়। এরপর নিয়ম অনুযায়ী তারা শপথ নেন।


স্পিকারের চেয়ারে বসে হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, “গণতন্ত্র সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন ব্যবস্থা। সরকার ও বিরোধী দল উভয়ে জাতির স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করি। বিরোধী দল যাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে সে জন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকব। ইতিমধ্যে আমি নিরপেক্ষতার খাতিরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির পদ থেকে পদত্যাগ করেছি।” এ সময় নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে নিরপেক্ষ থেকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “আজ থেকে আপনারা আর কোনো দলের নন। আপনারা এই সংসদের স্পিকার।”




প্রশ্ন উঠেছে, দলের সকল পর্যায়ের পদ থেকে পদত্যাগ করায় মেজর হাফিজ ও ব্যারিস্টার কায়সার আর জাতীয় সংসদের সদস্য আছেন কি না? যদি তারা সংসদ সদস্য না থাকেন তাহলে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারও থাকতে পারেন না।


সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দুটি কারণে সংসদ সদস্যপদ বাতিল হয়ে যায়। ১. যে দল থেকে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন, সেই দল থেকে পদত্যাগ করলে অথবা ২. সংসদে নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দিলে।


পদত্যাগপত্রে স্থায়ী কমিটি এবং নির্বাহী কমিটির পদ ছাড়ার কথা বলা হলেও দলের সাধারণ সদস্যপদ ছাড়ার কথা বলা হয়নি। সেক্ষেত্রে তাদের সংসদ সদস্যপদও বাতিল হবে না। কিন্তু তারা দুজনই বিএনপির সকল পর্যায়ের পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের কথা লিখেছেন। এর মধ্য দিয়ে তারা দলের প্রাথমিক সদস্যপদও হারালেন কি না, সেই প্রশ্ন উঠছে। যদি তাই হয়, অর্থাৎ দলের সব পর্যায়ের পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ বললে দলের প্রাথমিক সদস্যপদও থাকে কি না, সেটি বিরাট প্রশ্ন। সেক্ষেত্রে ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাদের সংসদ সদস্যপদ বাতিল হয়ে যাওয়ার কথা। কাজেই বিএনপির তরফে এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা জরুরি যে, এই পদত্যাগের মধ্য দিয়ে হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ও কায়সার কামালের প্রাথমিক সদস্যপদ বাতিল হয়েছে কি না? অর্থাৎ স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার বিএনপির সকল পর্যায়ের পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের যে ঘোষণা দিয়েছেন, তার মধ্য দিয়ে দলের তাদের প্রাথমিক সদস্যপদও বাতিল হয়েছে কি না, সেটি পরিষ্কার করা জরুরি। যদি তাদের সদস্যপদ না থাকে তাহলে তারা সংবিধান অনুযায়ী আর সংসদ সদস্য থাকতে পারবেন না।


প্রসঙ্গত, সংসদ সদস্যদের পদ বাতিল সম্পর্কিত সংবিধানের যে ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে এখনো বিতর্ক হয় এবং যে বিধানকে মনে করা হয় সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মত প্রকাশের পথে সবচেয়ে বড় বাধা, সেটা নিয়ে বিতর্ক শুরু ১৯৭২ সালে গণপরিষদ গঠনকালেই।


১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ বাংলাদেশ কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলি মেম্বারস (সেসেশন অব মেম্বারশিপ) অর্ডার নামে যে আইনটি করা হয়, সেখানে বলা হয়—গণপরিষদের যে সদস্য নিজ দল থেকে পদত্যাগ করবেন বা নিজ দল থেকে বহিষ্কৃত হবেন, তিনি আর পরিষদের সদস্য হিসেবে থাকতে পারবেন না।


১৯৭২ সালে সংবিধান বিলে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হলে এ নিয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়। সংবিধানের খসড়া প্রণয়ন কমিটির জ্যেষ্ঠতম সদস্য হাফেজ হাবীবুর রহমানও (১৯১৫-১৯৮৯) এই বিধান নিয়ে নিজের আপত্তির কথা জানান। তিনি এ বিষয়ে সংবিধান বিলের সঙ্গে নোট অব ডিসেন্ট দেন। শুধু তিনি একা নন, সংবিধান প্রণয়ন কমিটির আরও চার সদস্য (আসাদুজ্জামান খান, এ কে মোশাররফ হোসেন আকন্দ, আব্দুল মুন্তাকীম চৌধুরী ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত) ৭০ অনুচ্ছেদের বিরোধিতা করেন।


পরে গণপরিষদ সদস্য নুরুল হকের প্রস্তাবক্রমে এই অনুচ্ছেদটি সংশোধিত আকারে গৃহীত হয়। ৭০ অনুচ্ছেদের ওপর তিনি যে সংশোধনী আনেন সেটি এরকম—“কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি (ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাঁহার আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোনো নির্বাচনে সংসদ সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।” (আমীন আল রশীদ, বাংলাদেশের সংসদীয় বিতর্ক, মাতৃভাষা প্রকাশ/২০২৫, পৃ. ২২)।


১৯৯১ সালে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর সময় এই অনুচ্ছেদে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হলেও ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর সময় বাহাত্তরের মূল সংবিধানের বিধান ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু তারপরও সংবিধানের এই অনুচ্ছেদটি নিয়ে বারবারই আলোচনা হয় এ কারণে যে, বলা হয় এটি সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মত প্রকাশ বাধাগ্রস্ত করে। দলের অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাদের চুপ থাকতে বাধ্য করে। অর্থাৎ বিধানটি নিয়ে এক ধরনের ভীতি রয়েছে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

এই সম্পর্কিত

আরও