আমাদের বোধগম্যতার জিপিএ ফাইভ

 এক. 

একজন নিউজ এডিটরকে বললাম, ‘আপনি স্টোরিটাকে নিজে যে ভাষায় বোঝেন সে ভাষায় না সাজিয়ে, পাঠক যে ভাষায় বোঝে সে ভাষায় সাজান। সংবাদ পাঠকের বোধগম্য হওয়া উচিত।’ এমন কথায় এডিটর বেচারি সম্ভবত ‘ইনসাল্টেড ফিল’ করলেন। বললেন, ‘আমার পড়াশোনা সাংবাদিকতায়, সংবাদটা আমি ভালো বুঝি।’ 

গণ্ডগোলটা এই ‘ভালো বোঝা’তেই। কারও ভালো বোঝা অন্যের জন্য ‘বোঝা’ হয়ে যায় এটা ‘ভালো বোঝা’দের ক্ষেত্রে প্রায়ই থেকে যায় বোধের অগম্য। তারপরেও বললাম, ‘সব পাঠকই নিশ্চয়ই সাংবাদিকতা, বাংলা কিংবা ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র নন, যে তাদের উচ্চমার্গের ভাষা বোধগম্য হবে, সুতরাং বোধের অগম্য ভাষায় না লেখাই উচিত।’

কুকুর আর সারমেয় অর্থে আলাদা না হলেও বোঝার ক্ষেত্রে আলাদা। সকল মানুষের বোধগম্য শব্দই সংবাদে ব্যবহৃত হওয়া উচিত। চেয়ারকে ‘কেদারা’ লিখলে হয়তো বাংলা বিশারদদের সমস্যা নেই কিন্তু সাধারণ পাঠক বিরক্ত হবেন। একজন রিকশাওয়ালার কাছে প্রচলিত ‘ইন্যুভার্সিটি’ যতটুকু বোধগম্য ততটাই বোধের অগম্য ‘বিশ্ববিদ্যালয়’। জটিলতম ‘তৎসম’ শব্দের ব্যবহার হতে পারে কবিতায়, প্রয়োজনে প্রবন্ধেও। সেক্ষেত্রে ‘চোখ’ বোঝাতে চক্ষু, নয়নসহ আরও সমার্থক শব্দ ব্যবহৃত হতে পারে। কিন্তু সংবাদে ‘চোখে’র কোনো বিকল্প শব্দ নেই। কিন্তু আজকাল প্রায়শই বিকল্পের চর্চা চলছে সংবাদমাধ্যমে; হয়তো মানুষও তাই সংবাদমাধ্যমের বিকল্প হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্ত হয়ে উঠছেন। 

দুই. 

জেএসসি ও পিইসি পরীক্ষার রেজাল্ট হয়েছে। আগে ভালো রেজাল্ট করলে অনেকে দেখতে আসত, এখন খারাপ রেজাল্ট বা ফেল করলে দেখতে আসে। চেষ্টা চলছে এমন কাউকে যেন দেখতে আসতে না হয়। অর্থাৎ সবাই যেন পাশ করে। খুব ভালো কথা। সম্ভবত পৃথিবীতে ‘শতভাগ পাশ’ তত্ত্বের আবিষ্কারকও আমরা, সাথে প্রায়োগিক ব্যাপারেও ‘ঋদ্ধকাম’। ‘ঋদ্ধকাম’ শব্দটির মানে হচ্ছে সৌভাগ্যবান। আমরা এত একটা কঠিন কাজে সফল হয়েছি সেই কঠিনতম সফলতা সেলিব্রেট করতেই কঠিন ‘ঋদ্ধকাম’ আমদানি। 

কিন্তু এই সেলিব্রেশনে বাধ সেধেছে কিছু খারাপ রেজাল্ট বা ফেল করা শিক্ষার্থী। তারা হুটহাট আত্মহত্যা করে বসছে। ‘জেএসসিতে ফেল করে কিশোরীর আত্মহত্যা’, সকালে সেলফোনের পর্দায় একটি গণমাধ্যম জানাল এমন খবর। কী ফ্যাসাদ বলুন দেখি। রেজাল্ট খারাপ করলেই এমনটা করতে হবে। এই ‘এমনটা’ মানে আত্মহত্যা ঠেকাতেই তো ‘শতভাগ পাশে’র তত্ত্ব এবং তত্ত্বের গুরুত্বটা।

একসময় পরীক্ষায় নকল হতো। বাপ, ভাই এমন কী মা পর্যন্ত, সাথে প্রাইভেট টিউটরও বাদ যেতেন না নকল সরবরাহের কাজে। তখন নাকি প্রাইভেট টিউটরদের পড়ানোর পাশাপাশি এক্সট্রা গুন ছিল নকল সরবরাহের দক্ষতা। এমন দক্ষ টিউটরদের জন্য সেসময় ‘সহনশীল’ মাত্রায় ‘উপরি’র প্রচলন ছিল। তখন পরীক্ষা কেন্দ্রের আশেপাশে রীতিমত মেলা বসে যেত, সে এক দর্শনীয় ব্যাপার। মা-বাবা, ভাই, শিক্ষক উৎকণ্ঠিত বসে আছেন, চলছে নকল পৌঁছানোর নানা রকম কোশেস। সাথে হাঁকছে বাদামওয়ালা, চায়ের দোকানিও ব্যস্ত অস্থায়ী দোকানে। বলতে পারেন, পরীক্ষার দিনগুলোতে বাদামওয়ালা থেকে চা-পানের দোকানি সবারই কিছু ‘উপরি’ আয় হতো। অবশ্য যারা পরীক্ষার দায়িত্বে থাকতেন তাদেরও হতো সহনশীল মাত্রায়। সেসময়ও শতভাগ পাশ করানোর চেষ্টা ছিল, কিন্তু হৈ-হুল্লোড়ের কারণে হয়নি। বিশেষ করে সংবাদমাধ্যমগুলোর ‘হৈ-হুল্লোড়ে’। সে সময় উচ্চমার্গের ভাষাবিদ এডিটররা ছিলেন না, থাকলে অন্তত সে যাত্রায় ভাষার মারপ্যাচে পার পাওয়া যেত।  

এরপর এলো কঠিন দিন। স্কুল-কলেজে না গিয়ে, ক্লাশ না করে ‘নো চিন্তা ডু নকল’ এর দিন গত হলো। বন্ধ হলো নকলের আনন্দ আয়োজন। শিক্ষার্থীদের ছুটতে হলো স্কুল-কলেজে। শিক্ষকদেরও ক্লাশ নিতে হলো বাধ্য হয়েই। অনেকের ‘উপরি’ আয় উঠলো লাটে। শিক্ষার্থীরা পড়ার টেবিলে সরব হয়ে উঠলেন। ‘উপায় নেই গোলাম হোসেন’ অবস্থা, না পড়লে ‘না’তেই থাকতে হবে। এমন অবস্থায় শিক্ষার্থীদের সাথে শিক্ষকদেরও একটা বড় অংশ নাখোশ হলেন। যেহেতু পরীক্ষার খাতা দেখতে হতো নিজেদেরই। এর কোনো বিকল্প নেই, ‘বাইপাস’ও ছিল না। তারপরেও বেশিরভাগের রেজাল্টই হতো মোটামুটি। বড় একটি অংশ হতেন অকৃতকার্য। ছোট একটি অংশ করতেন ভালো রেজাল্ট। এরমধ্যেও ছিল প্রথম দ্বিতীয়ের ব্যাপার-স্যাপার। এই প্রথম দ্বিতীয়দের ছবি বের হতো খবরের কাগজে। সাথে বাবা-মা এমন-কি প্রিয় শিক্ষকের ছবিও ছাপত কাগজগুলো। সেসব শিক্ষার্থীরা হাসিমুখে রিপোর্টারদের সাথে কথা বলতেন, আর সাক্ষাতকার নাম দিয়ে সেই সব কাগজে ছেপে তৈরি করা হতো ‘বৈষম্যে’র। 

এটা বৈষম্য নয়তো কী! অন্য শিক্ষার্থীদের ‘শ্রমের মূল্য’ না দিয়ে কেবল প্রথম-দ্বিতীয় হওয়াদের নিয়ে হতো লাফালাফি। ‘শ্রমভিত্তিক’ সমাজ গড়ার চিন্তা বাদ দিয়ে ‘মেধাভিত্তিক’ সমাজ গড়ার একটি বৈষম্যমূলক প্রয়াস সেই ‘লাফালাফি’র সময়েই শুরু হয়েছিল। সেই বৈষম্যমূলক প্রয়াসের অবশ্যই নিন্দা জানানো উচিত ছিল তখনই। অবশ্য ‘দেরিতে হলেও সহি’ এখনও তা করা যায়, যায় তো? 

আপনারা ভেবে দেখুন সে সময় সমাজে ‘শ্রমের মর্যাদা’ বিষয়টি একেবারে উঠে যেতে বসেছিল। দু’চার নম্বর বেশির কারণে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল ভয়াবহতম একটি ‘বৈষম্য’। একে ‘ফল বৈষম্য’ হিসেবেও আখ্যায়িত করতে পারেন। এমন বৈষম্যের কারণে রডের বদলে যে স্বল্প খরচে বাঁশ দিয়েই কাজ চালিয়ে দেওয়া যায় দু’চার নম্বর বেশি পাওয়া সেই শিক্ষার্থীদের তা অবোধ্য থেকে যেত! বিকল্প বিষয়ে কোনো জ্ঞানই তাদের ছিল না। তবে সেই দিন আর নাই। এদিনের শিক্ষার্থীরা আছেন ‘নো টেনশনে’। গ্রাফটা উল্টে গিয়ে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই ভালো রেজাল্ট করছেন। অল্প কিছু খারাপ রেজাল্ট আর হাতেগোনা ‘ফেল’। ভবিষ্যতে হয়তো ‘অল্প কিছু’ আর ‘হাতে গোনা’র বৈষম্যটাও থাকবে না। অতঃপর শুধুই ‘নো চিন্তা ডু ফুর্তি এন্ড আই এ্যাম জিপিএ ফাইভ’। ওকে, লেটস এনজয় গাই’স। 

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কম-এর সম্পাদকীয় নীতির মিল নাও থাকতে পারে।]