দীনদয়ালকে বিবেকানন্দের মর্যাদা?

ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের ভেতর দিয়ে ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির প্রচলন আরএসএসসহ (রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ) গোটা সঙ্ঘ পরিবার এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির একটি পরিকল্পিত কর্মসূচি। এই কর্মসূচিকে ত্বরান্বিত করবার উদ্দেশ্যে বহুদিন ধরেই স্বামী বিবেকানন্দকে ব্যবহারের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবির। বস্তুত এই কর্মসূচি তারা নিয়েছিল ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংস করবার পর সেই সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পরিপ্রেক্ষিতে আরএসএস-বিজেপির কিছুটা সামাজিকভাবে কোনঠাসা হয়ে পড়বার পরিস্থিতির মোকাবিলার উদ্দেশ্যে।

সাংগঠনিকভাবে আরএসএস অনেক আগে থেকেই বিবেকানন্দকে ব্যবহার করছে তাদের নিজস্ব বিকৃত ব্যাখ্যার ভিতর দিয়ে। বিবেকানন্দর চিকাগো বক্তৃতার ১২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আস্ফালন সূচক ভাষণ, মোদিকেই  ‘নবরূপে নরেন্দ্র’ হিসেবে তুলে ধরবার সাম্প্রদায়িক তান্ডব, বিজেপি সভাপতি অমিত শাহর কলকাতাতে স্বামীজীর বাড়িতে গিয়ে শ্রদ্ধার্পণের নামে দলীয় প্রচার - এগুলি হিন্দুত্ববাদী শক্তির কোনো হঠাৎ করে নেওয়া সিদ্ধান্তের ফলশ্রুতি হিসেবে ভাবলে ভুল হবে।

হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তি দীর্ঘদিন ধরে গোটা দেশের মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর ভিতরে নিজেদের সামাজিক, রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করবার উদ্দেশ্যে সুপরিকল্পিতভাবে বিবেকানন্দকে ব্যবহার করে আসছে। আরএসএস তাদের সাংগঠনিক তত্ত্বের প্রসারের উদ্দেশ্যে বিবেকানন্দকে বিকৃতভাবে ব্যবহার করে নিজেদের বিবেকানন্দর উত্তরসূরী হিসেবে দেখাবার চেষ্টা বহুদিন ধরে করে চলেছে। আরএসএসের পাঠক্রমে স্বামীজীর একটি বক্তৃতার একটি ক্ষুদ্রাংশ ব্যবহার করা হয়। সেটি হল, ‘হে বন্ধুগণ, এইজন্য আমার সংকল্প এই যে ভারতে আমি কতকগুলি শিক্ষালয় স্থাপন করিব। তাহাতে আমাদের যুবকগণ ভারতে এবং ভারত বহির্ভূত দেশে আমাদের শাস্ত্রনিহিত সত্যসমূহ প্রচার করিবার কাজে শিক্ষালাভ করিবে।মা নুষ চাই, মানুষ চাই আর সব হইয়া যাইবে। বীর্যবান সম্পূর্ণ অকপট , তেজস্বী বিশ্বাসী যুবক আবশ্যক।…সকলের নিকট তোমাদের ধর্মের সত্যসমূহ প্রচার কর, প্রচার কর জগৎ এই সকল সত্যের জন্য অপেক্ষা করিতেছে।’

বিবেকানন্দের এই খন্ডিত উদ্ধৃতি ব্যবহারের শেষেই আরএসএস বলছে, ‘অর্থাৎ প্রচারক কর্মী চাই’। স্বয়ংসেবকও নয়, বিবেকানন্দর কথার রেশ হিসেবে সরাসরি ‘প্রচারক কর্মী’ চাইছে সঙ্ঘ। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, আরএসএসের প্রচারক নরেন্দ্র মোদি এখন ভারতবর্ষের প্রধানমন্ত্রী।

স্বামীজীর যে বক্তৃতাটির অংশ এখানে সঙ্ঘ ব্যবহার করছে সেটি চিকাগো থেকে প্রত্যাগমণের পর মাদ্রাজের ভিক্টোরিয়া হলে দিয়েছিলেন বিবেকানন্দ। বক্তৃতাটি ‘আমার সমরনীতি’ নামে স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনাতে সঙ্কলিত হয়েছে ( উদ্বোধন। ১৯৯৭ সঙ্করণ) । সংশ্লিষ্ট বক্তৃতায় যে অনুচ্ছেদটি আরএসএস ব্যবহার করে তার ভেতর ‘এইরূপ একশত যুবক হইলে সমগ্র জগতের ভাবস্রোত ফিরাইয়া দেওয়া যায়। অন্য কিছু অপেক্ষা ইচ্ছাশক্তির প্রভাব অধিক। ইচ্ছাশক্তির কাছে আর সবই শক্তিহীন হইয়া যাইবে, কারণ ঐ ইচ্ছাশক্তি সাক্ষাৎ ঈশ্বরের নিকট হইতে আসিতেছে। বিশুদ্ধ ও দৃঢ় ইচ্ছার শক্তি অসীম। তোমরা কি ইহা বিশ্বাস কর না?’- এই অংশটি যেহেতু স্বামীজী নির্দিষ্ট কর্মীর সঙ্গে সঙ্ঘের প্রচারক কর্মীকে মেলানো যায় না- তাই এটি বাদ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, আরএসএস চিরদিনই বিবেকানন্দের সামগ্রিক কথার থেকে যে খন্ডাংশ তাদের অনুকূলে যায় সেভাবেই তাদের কর্মী সমর্থকদের সামনে তুলে ধরে। এভাবেই দীর্ঘকাল ধরে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে আরএসএস এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি ব্যবহার করে চলেছে স্বামী বিবেকানন্দকে। অতি সাম্প্রতিক কালে স্বামীজীর চিকাগো বক্তৃতার ১২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা ছাত্র সমাজকে বাধ্যতা মূলক ভাবে শোনানো বা অমিত শাহের কলকাতায় বিবেকানন্দের বাড়ি যাওয়াকে রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার- সেই প্রক্রিয়ারই একটি অঙ্গ।

উগ্র হিন্দুত্বের কথা বলে একটি অংশের মানুষকে নিজেদের পাশে পেলেও সামগ্রিকভাবে দেশের হিন্দুসভা আরএসএস - বিজেপির সাম্প্রদায়িক চেতনা এবং ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের প্রবণতার সঙ্গে কিছুতেই নিজেদের একাত্ম করেনি। ভারতের হিন্দু জনসাধারণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই বৈচিত্র্যময় ভারতীয় সংস্কৃতি এবং বহুত্ববাদী দর্শনে বিশ্বাস করেন। আরএসএস - বিজেপির শত চেষ্টা স্বত্ত্বেও গ্রামীণ ভারতের আত্মা থেকে সমন্বয়ী চেতনার ধারাবাহিকতাকে কেউ বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। প্রথাগত শিক্ষার অভাবে অসুখ করলে চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে মন্দির - মসজিদের চাতালে হত্যে দেওয়ার প্রবণতা আজও জাতি ধর্ম নির্বিশেষে মানুষের আছে। এই প্রবণতা যেমন সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের ভিতরে আছে তেমনিই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ভিতরেও আছে একটা সম্প্রীতির পরিবেশের প্রতি পক্ষপাতিত্ব। হিন্দু- মুসলিম- উভয় সম্প্রদায়েরই সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তি দেশের মধ্যবিত্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের গোটাটাকে সার্বিকভাবে আজও সাম্প্রদায়িক করে তুলতে পারে নি। এই নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত হিন্দুদের ঘোরতর সাম্প্রদায়িক করে তুলবার উদ্দেশ্য নিয়েই আরএসএস- বিজেপি এখন বিবেকানন্দের আরএসএসীয় করণ ঘটাতে তৎপর। তাই সর্ব অংশে যে দীনদয়াল উপাধ্যায় একটি মুহুর্তের জন্যেও আরএসএসীয় পরিকাঠামোর বাইরে বেরোননি, সেই দীনদয়াল এবং বিবেকানন্দকে এখন সমমর্যাদা দিতে আদাজল খেয়ে আসরে নেমে পড়েছে অসভ্য বর্বর হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি।

নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচি ‘সাম্প্রদায়িকতা’র প্রসার ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে হিন্দুত্ববাদী শক্তি বেশ কিছু কৌশলগত অদলবদল এনেছে। এই কৌশলগত পরিবর্তনের একটা বড়ো পর্যায় হলো জন্মমুহুর্ত থেকে (১৯২৫) এই পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে যে হেডগেওয়ার এবং গোলওয়ালকরকেই আরএসএস নিজেদের সাংগঠনিক এবং তার বাইরের পরিমন্ডলে এতোকাল সবথেকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে এসেছে এখন থেকে এদের পরিবর্তে তারা দীনদয়াল উপাধ্যায় এবং সাভারকারকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেবে। মোদি ক্ষমতায় আসার সময়কাল থেকেই দীনদয়ালকে নিয়ে এদের মাত্রাতিরিক্ত আধিক্য আমরা দেখেছি। এই মুহুর্তে পরীক্ষামূলকভাবে এই দীনদয়াল এবং সাভারকরকে সবথেকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে রাজস্থানের স্কুল পাঠ্য বইগুলিতে। কৌশলগত কারণেই আরএসএস গোলওয়ালকরের মতো একেবারে সঙ্ঘের পরিমন্ডলে থাকা লোকের পরিবর্তে সঙ্ঘ এবং তার প্রথম দফার রাজনৈতিক সংগঠন ভারতীয় জনসঙ্ঘের সঙ্গে যুক্ত দীনদয়ালকেই সামনে নিয়ে আসছে। এই দীনদয়ালকে বিবেকানন্দের সমুচ্চতা দিতে তাই সঙ্ঘ এবং বিজেপির সর্বস্তরের নেতা কর্মীরা উদগ্রীব।

কেন বিবেকানন্দকে এভাবে নিজেদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধিতে ব্যবহার করছে আরএসএস তা বোঝা যায় সঙ্ঘকর্মীদের প্রতি দেওয়া গোলওয়ালকরের নির্দেশিকা থেকে। ১৯৫৬ সালে কোয়েম্বাটুরে সঙ্ঘ কর্মীদের উদ্দেশ্যে গোলওয়ালকর বলেছিলেন, ‘আন্দোলনের আন্তর্জাতিক মূর্তিটা যতোটা বাস্তব তার চেয়ে বেশি প্রদর্শনীর। এসবের পিছনে একটি বা একাধিক শক্তিশালী রাষ্ট্র রয়েছে, এরা বাকি পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এ আসলে গর্বিত উদ্ধত জাতীয়তাবাদ। সত্য আন্তর্জাতিকতা নয়। দুর্ভাগ্যক্রমে এই আত্মদর্পী শক্তির চাকচিক্যে হিন্দুর বর্তমান দুর্বল দৃষ্টি ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। আমি হিন্দুত্বকে শান্তিপূর্ণ আন্তর্জাতিকতায় খাঁটি পদ্ধতি হিশেবে দেখি। আর সকল ইজম একসঙ্গে যতোখানি, হিন্দুধর্ম তারচেয়েও বেশি ভব্য আন্তর্জাতিকতার ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত।’ (স্পট লাইটস-এমএস গোলওয়ালকর। সত্যি হিন্দু, ব্যাঙ্গালুরু, কর্নাটক,১৯৭৪। প্রথম সংস্করণ পাতা ১১৯)।

এই হিন্দুত্বের মোড়কে জাতীয়তা এবং আন্তর্জাতিকতার যে দিক নির্দেশ গোলওয়ালকর সঙ্ঘকর্মীদের উদ্দেশ্যে করে গিয়েছিলেন সেটিকেই অনুসরণ করে বিবেকানন্দর গায়ে নাগপুরীয় রাজনৈতিক হিন্দুর লেবেল সাঁটতে চায় আরএসএস- বিজেপি। তাই বিজেপির রাজ্য সভাপতি  দিলীপ ঘোষ প্রকাশ্যেই বিবেকানন্দ ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তিত্ব নন বলে মন্তব্য করেছেন। বিবেকানন্দকে আরএসএস ব্যবহার করে নিজেদের সুবিধা মতো খন্ড ক্ষুদ্র করে। বিবেকানন্দকে উদ্ধৃত করতে হলে যেভাবে খাপছাড়া করে তাঁর লেখার যে যে অংশ হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছাকাছি যেতে পারে, সেই ভাবে তারা ব্যবহার করে। হয়তো প্রকৃত পক্ষে দেখলে দেখা যাবে যে অংশটিকে রাজনৈতিক হিন্দুরা ব্যবহার করছে ঠিক তার পরের অংশের বিবেকানন্দর কথাটি চরম ভাবে আরএসএস, বিজেপির মতাদর্শের বিরোধী।

বিবেকানন্দ শিবজ্ঞানে জীবসেবার কথা বলেছিলেন। তাঁর শিকাগো বক্তৃতার ১২৫ বছর পূর্তিতে তাঁকে সঙ্ঘ নেতা দীনদয়াল উপাধ্যায়ের সঙ্গে একই পঙক্তিতে বসিয়ে যখন প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করছেন, তাঁর সেই বক্তৃতা শোনা বাধ্যতামূলক বলে ফর্মান জারি করেছে খোদ ইউজিসি। সেই সময়ে রাজস্থানের জয়পুরের অদূরে রামগঞ্জ এলাকার মানুষ সাম্প্রদায়িক দস্যুদের হাতে নিহত ২৪ বছরের তরতাজা যুবক মহম্মদ রিয়াজ ওরফে আদ্রিলের হত্যার বিচার চাইতে পথে নেমেছে। এই ভাবে ধ্বংসের পথেই ভারতবর্ষকে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন গোলওয়ালকর। প্রকাশ্যে সেই গোলওয়ালকরকে তার ক্ষিপ্র সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির জন্যে এখন একটু আড়াল আবডালেই রাখে আরএসএস। কার্যক্ষেত্রে অবশ্য গোলওয়ালকরকেই মান্যতা দেয় সবথেকে বেশি।

গোলওয়ালকর ১৯৭২ সালে মহারাষ্ট্রের থানেতে বলেছিলেন, ‘‘হিন্দুধর্মের অনুপম বৈশিষ্ট্যগুলির অন্যতম ‘একম সদ বিপ্রা বহুধা বদন্তি।’ সত্য একই , ঋষিরা তাকে নানারূপে বলেন। দ্বিতীয়ত, অন্যরা যেখানে সুখশান্তির জন্য বাহ্যিক আচরণ করছে, আমাদের দর্শন অন্তকরণে সন্ধান করছে। এই অন্তরিত শান্তিকে শ্রেয়স বলা হয়। সকলকে যতোদূর বেশি সুখী করতে হলে সকলের জন্য এই শ্রেয়সের কথা আমাদের সমাজকে মনে রাখতে হবে। আমাদের চেতনায় নির্বিশেষ সত্তা অনুভবের কথা বলা হয়েছে। তাই এই শ্রেয়সের দার্শনিক ভিত্তি। গীতায় বলা হয়েছে, ঈশ্বরসর্ব ভূতানাম হৃদেশোর্জুনোতিষ্টতি।' সকল জীবে পরমাত্মার এমন অধিষ্ঠানের কথা অন্য কোথাও আর পাওয়া যায় না’’( গোলওয়ালকর-ঐ পৃষ্ঠা- ১১৯-১২০) ।

গোলওয়ালকরের এই বক্তৃতাকে আর সএস নিজেদের সাংগঠনিক স্তরে বিবেকানন্দের মাদ্রাজে দেওয়া শেষ বক্তৃতা র সঙ্গে তুলনা করে থাকে। ‘ভারতের ভবিষত’ নামক পরবর্তীকালে সঙ্কলিত বিবেকানন্দের এই বক্তৃতাটি র কোনো অংশে এমন একটি শব্দও নেই যেটি আরএসএসের ভাবধারার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। বিবেকানন্দ মাদ্রাজে তাঁর এই শেষ বক্তৃতাটি রেখেছিলেন একটি বিরাট তাঁবুর ভিতরে। সেই বক্তৃতাটি শুনতে প্রায় চার হাজার মানুষের ভিড় হয়েছিল। সেই বক্তৃতাতে দীপ্তকন্ঠে বিবেকানন্দ বলেছিলেন, ‘আমরা যে মন্দির প্রতিষ্ঠার কথা বলিতেছি , উহা অসাম্প্রদায়িক হইবে।’  সার্বিক ভাবে অসাম্প্রদায়িকতার উপাসক বিবেকানন্দ ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন না, অর্থাৎ সাম্প্রদায়িক ছিলেন, আরএসএসের ভাবধারায় নির্মিত নাগপুরের কেশব ভবনের ছাপমারা রাজনৈতিক হিন্দু ছিলেন- এটাই আজ দেখাতে চায় আরএসএস- বিজেপি।

বিবেকানন্দের এই ‘ভারতের ভবিষ্যত’ এর পথেই হেডগেওয়ারের কথাতে তুলে ধরে সঙ্ঘের নেতাদের মতো মামুলি ব্যক্তিত্ব বিবেকানন্দ ছিলেন- সেটা দেখাবার ষড়যন্ত্র আরএসএস - বিজেপি বহুদিন ধরেই করে চলেছে। হেডগেওয়ার বলেছিলেন, আমাদের কাজ হিন্দু সমাজের জন্য, সেই কারণে তার কোনো অঙ্গের প্রতি উপেক্ষা করলে কাজ চলবে না। সমস্ত হিন্দু ভাইদের সঙ্গে, তারা যে কোনো উচ্চ বা নিম্ন শ্রেণীর বলে গণ্য হোন না কেন, আমাদের ব্যবহার সমান ভালোবাসার হওয়া উচিত ( হিন্দুরাষ্ট্রের নবনির্মাতা ডাঃ হেডগেওয়ার - বাপুসাহেব ভীশীকর। নিবন্ধকার সংশ্লিষ্ট গ্রন্থের জীতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় কৃত অনুবাদটি ব্যবহার করেছেন।১৯৮৮ সঙ্করণ।পৃষ্ঠা- ৬৪) ।

১৮৯৫ সালে প্রিয় শিষ্য আলাসিঙ্গা পেরুমলকে লেখা একটি চিঠিতে বিবেকানন্দ বলেছিলেন, একটি সঙ্ঘের বিশেষ প্রয়োজন। বিবেকানন্দ একটি সঙ্ঘ বলতে আরএসএসের আদলে একটি সঙ্ঘের কথা বলেছিলেন- এটাই হেডগেওয়ার বলেছেন বলে সঙ্ঘের পক্ষ থেকে প্রচার করা হয় ( রাষ্ট্রতপস্বী হেডগেওয়ার-- আরএসএসের প্রকাশন বিভাগ। কলকাতা।১৪০৬ বঙ্গাব্দ।পৃষ্ঠা- ১২০-১২১) ।

এভাবেই বিবেকানন্দের সঙ্ঘীকরণ করা হয়েছে হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শিবিরের দ্বারা। সেই লক্ষ্যেই বিবেকানন্দের শিকাগো বক্তৃতার ১২৫ বছর পূর্তিকে কেন্দ্র করে গোটা প্রক্রিয়াটির একটি আরএসএসীয় করণ করা হয়েছে। বিবেকানন্দর জন্মভিটায় বিজেপি সভাপতি অমিত শাহের সফরটিকে যেভাবে রাজনৈতিক রঙ দেওয়া হয়েছে তা থেকেই বুঝতে পারা যাচ্ছে যে, শিক্ষিত মধ্যবিত্তের ভাবাবেগকে নিজেদের স্বার্থে কি ভাবে ব্যবহার করতে চাইছে আরএসএস এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি। বিবেকানন্দর উত্তরসূরী হিসেবে নরেন্দ্র মোদিকে দেখাবার প্রবণতার ভিতর দিয়ে ফুটে উঠেছে ইতিহাস বিকৃতির এক মারাত্মক প্রবণতা। এই প্রবণতা রুখতে এই মুহুর্তেই সমস্ত রকমের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন , ধর্মনিরপেক্ষ মানুষদের সার্বিক প্রতিরোধ প্রয়োজন।

গৌতম রায়: প্রাবন্ধিক। পেশায় অধ্যাপক, গবেষক। দীর্ঘদিন অন্নদাশঙ্কর রায়ের সাহিত্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন।

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কম-এর সম্পাদকীয় নীতির মিল নাও থাকতে পারে।]