মানবতা কি ক্যামেরার পেছনে হারিয়ে যাচ্ছে?

ঢাকা পোষ্ট ড. সুলতান মাহমুদ রানা প্রকাশিত: ০২ জুন ২০২৬, ১২:১২

ঈদের নতুন জামা কিনে আর বাড়ি ফেরা হলো না দেড় বছর বয়সী শিশু সাফওয়ান ওরফে হাসেন এবং তার মায়ের। ঈদকে সামনে রেখে নতুন পোশাক কিনে বাড়ি ফেরার পথে ট্রেনের ধাক্কায় মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান মা-ছেলে। ২৭ মে রাতে নরসিংদী রেলস্টেশনে এ দুর্ঘটনা ঘটে।


নরসিংদী রেলস্টেশনের সেই মর্মান্তিক দৃশ্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। তবে ভাইরাল হওয়া দৃশ্যটি আমাদের এক নতুন বার্তা দিচ্ছে। যে ছবিটি আমাদের সামনে এসেছে সেটি আমাদের সময়ের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।


ট্রেনের ধাক্কায় মা ও দেড় বছরের শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু, আহত অবস্থায় স্বামীর ছুটে চলা, আর চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য মানুষ- যাদের অনেকের হাতেই ছিল মোবাইল ফোন। কেউ ভিডিও ধারণ করেছে, কেউ ছবি তুলেছে, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপলোড করেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, কতজন এগিয়ে এসেছিল সাহায্যের জন্য?


সারা বিশ্বেই প্রযুক্তির বিস্তার মানুষের আচরণে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। আমরা এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি, যেখানে অনেক সময় মানুষের প্রথম প্রতিক্রিয়া হয় সাহায্য করা নয়, বরং ঘটনাটি ধারণ করা। যেন বাস্তবতার চেয়ে তার ডিজিটাল রূপটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা এ প্রবণতাকে ব্যাখ্যা করার জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব দিয়েছেন। ১৯৬৮ সালে মনোবিজ্ঞানী জন এম. ডার্লি এবং বিব ল্যাটানে একসাথে ‘বাইস্ট্যান্ডার এফেক্ট’ তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। তাদের মতে, কোনো বিপদে যত বেশি মানুষ উপস্থিত থাকে, ব্যক্তিগতভাবে সাহায্য করার সম্ভাবনা তত কমে যায়। কারণ প্রত্যেকে মনে করে অন্য কেউ নিশ্চয়ই সাহায্য করবে। ফলে দায়িত্ব ছড়িয়ে যায়। কিন্তু কার্যকর সাহায্য আসে না।


নরসিংদীর ঘটনাটি যেন এই তত্ত্বের বাস্তব উদাহরণ। কিন্তু বর্তমান যুগে কেবল ‘বাইস্ট্যান্ডার এফেক্ট’ দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। আজকের সমাজে যুক্ত হয়েছে ‘ডিজিটাল বাইস্ট্যান্ডার এফেক্ট’। মানুষ মনে করে, ভিডিও ধারণ করাও এক ধরনের দায়িত্ব পালন। অথচ বাস্তবে আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়া, অ্যাম্বুলেন্স ডাকা কিংবা জনতাকে সংগঠিত করা অনেক বেশি প্রয়োজনীয় কাজ।


জার্মান সমাজবিজ্ঞানী জর্জ সিমেল আধুনিক নগরজীবনের একটি ধারণা দিয়েছিলেন, ‘ব্লেস অ্যাটিটিউড’। নগর জীবনে মানুষ প্রতিদিন এত ঘটনা, দুর্ঘটনা ও তথ্যের মুখোমুখি হয় যে, ধীরে ধীরে তার আবেগগত প্রতিক্রিয়া ভোঁতা হয়ে যায়। অন্যের কষ্ট আর তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। প্রতিদিন শত শত দুর্ঘটনা, যুদ্ধ, হত্যা, নির্যাতনের ভিডিও দেখতে দেখতে অনেকের মনে সহমর্মিতার পরিবর্তে এক ধরনের আবেগগত ক্লান্তি তৈরি হয়।


ফরাসি দার্শনিক জঁ বোদ্রিয়ার আরও গভীর একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, আধুনিক মানুষ বাস্তবতার চেয়ে তার প্রতিচ্ছবির মধ্যে বেশি বাস করে। অনেকের কাছে ঘটনাটি ঘটার চেয়ে সেটি রেকর্ড করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে একজন আহত মানুষ কখনো কখনো একজন সহায়তার প্রয়োজনীয় মানুষ হিসেবে না দেখে বরং ‘কনটেন্ট’ হিসেবে দেখা শুরু হয়।


এখানেই সবচেয়ে বড় বিপদ। যখন মানুষের কষ্ট অন্য মানুষের কাছে কনটেন্টে পরিণত হয়, তখন মানবিকতার জায়গাটি সংকুচিত হতে শুরু করে। আর সেই কাজটিই ক্রমাগতভাবে আমাদের সমাজব্যবস্থাকে আঁকড়ে ধরছে। তবে এর ফলাফল অনেক ভয়াবহ হতে চলেছে। যদি এমন আচরণ ক্রমাগত বাড়তেই থাকে তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে চরম মূল্য দিতে হবে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও