এসএসসি ও সমমানের ফল: অভিভাবক-শিক্ষার্থীদের জন্য সতর্কসংকেত
নির্ধারিত সময়ের তিন সপ্তাহ পরে প্রকাশিত হলো এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল। বিলম্ব হচ্ছে দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম অন্য কোনো ঘটনা আছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্র সঠিকভাবে মূল্যায়ন করলে পাসের হার ২০ শতাংশের ওপরে-নিচে থাকত। কিন্তু পাসের হার ছিল প্রায় শতভাগ! শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের সবাই এক গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিয়েছিল। তবে এর বিরুদ্ধে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন কাজ ছিল। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে জাতি একসময় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যেত। সে জায়গায় একটা বিরতি দেওয়া সম্ভব হয়েছে বর্তমান সরকারের দূরদর্শী পদক্ষেপের কারণে।
এবার সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা গত বছর ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ অর্থাৎ পাসের হার ৬ দশমিক ২০ শতাংশ কমেছে। এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ পরীক্ষার্থী, যা গতবার ছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন। ৬ লাখ ৯০ হাজারের বেশি ফেল এবং ৩১২ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কেউ পাস করেনি। ৬৯৯ প্রতিষ্ঠানের সবাই পাস করেছে। গত বছরের তুলনায় সার্বিক পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ কমেছে ২২ হাজার ৩৫৬। মাদ্রাসা বোর্ডে পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ, যা সর্বনিম্ন।
৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন দাখিল এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন এসএসসি ও দাখিল (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় এ বছর পরীক্ষার্থী ছিল ১৮ লাখ ২৯ হাজারের বেশি। এই কোমলমতি শিক্ষার্থীরাই আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ, তারাই একদিন দেশের সব দায়দায়িত্ব গ্রহণ করবে, হাল ধরবে। কাজেই তাদের সেভাবেই প্রস্তুত করতে হবে। যেনতেন পাস আর না পড়িয়ে শুধু গ্রেড দিয়ে বরং তাদের ক্ষতি করা হচ্ছিল। সেই অবস্থা থেকে বের হওয়া মাত্র শুরু হলো।
২০২৫ সালে পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। ওই বছর পাসের হার ও জিপিএ-৫ দুটিই কমেছিল, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম ছিল। ২০২৪ সালে মাধ্যমিক পাসের হার ছিল ৮৩ দশমিক ০৪ শতাংশ। ২০২৩ সালে এসএসসিতে পাসের হার ছিল ৮০ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ছিল ৮৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ। করোনা মহামারির মধ্যে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে হওয়া ২০২১ সালের এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ছিল সর্বোচ্চ ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
এভাবে প্রতিবছর পাসের হার বাড়িয়ে দেখানোর জন্য সঠিক কোনো কারণ ও ব্যাখ্যা শিক্ষা বোর্ডগুলো কিংবা শিক্ষা বিভাগ দেয়নি। তবে তাদের কিছু তৈরি করা উত্তর অর্থাৎ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবের জন্য তৈরি করা কিংবা হঠাৎ করে বলার প্রবণতা আমরা প্রতিবছরই দেখেছি। আসলে এসব নিয়ে যাঁরা কথা বলেন, তাঁদের মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকের সিলেবাস, পড়াশোনার ধরন কিংবা সমস্যাবলি সম্পর্কে তেমন গভীর ধারণা নেই। সাংবাদিকেরা তাঁদের দিকেই ক্যামেরা তাক করে রাখতেন মূল্যবান কিছু শোনার জন্য। কিন্তু তাঁরা অনুমানভিত্তিক, শুধু সংবাদপত্রের রিপোর্ট এবং চারদিকের অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে এবং নিজেদের অবস্থান থেকে কিছু মন্তব্য করতেন, যা বাস্তবের এবং মূল কারণের সঙ্গে অনেকটাই বেমানান। অথচ বোর্ডের একেক বছর একেক ধরনের ফল, এক বোর্ড থেকে অন্য বোর্ডে ফলের বিশাল পার্থক্য, শিক্ষার্থীদের অর্জিত দক্ষতা ও জ্ঞানে কতটা তফাত হচ্ছে, কেন হচ্ছে, এর বাস্তবসম্মত সমাধান কী কী হতে পারে—এগুলো অধরাই থেকে যেত।