আন্তর্জাতিক গেমস নিয়ে লক্ষ্য নির্ধারণ জরুরি
আন্তর্জাতিক বৃহৎ স্পোর্টস ইভেন্টে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের আলোচনা এক অস্বস্তিকর প্রতীকে পরিণত হয়েছে। স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে সদ্যঃসমাপ্ত ২৩তম কমনওয়েলথ গেমসে অংশ নিয়ে ক্রীড়াবিদরা ব্যতিক্রমী কিছুই উপহার দিতে পারেননি।
অর্থাৎ যা সব সময় অতীতে ঘটেছে, এবারও তা-ই ঘটেছে। প্রিন্ট মিডিয়ায় দেখেছি, একজন ক্রীড়া সংগঠক আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘পর পর দুটি কমনওয়েলথ গেমসে পদকশূন্য অবস্থায় ফিরে আসা শুধু দুঃখজনক নয়, বিরক্তিকরও বটে।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘মানবসম্পদের কী ভয়ানক অপচয়!’
বহু রকম অনৈতিকতার জালের মধ্যে আটকে আছে আমাদের ক্রীড়াঙ্গন। জনগণের প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির মধ্যে আছে অনেক ফারাক। ক্রীড়াঙ্গনে নেই আদর্শিক অবস্থানের গুরুত্ব। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে ঘাটতি ছিল বলে আমাদের স্বপ্নের ক্রীড়াঙ্গন আজও গড়ে ওঠেনি। ক্রীড়াঙ্গন চলছে দিগভ্রান্ত ও লক্ষ্যহীনভাবে। এত বছর পরও আমরা ক্রীড়াঙ্গনে লক্ষ্য স্থির করতে পারিনি।
আমরা জানি না, আমরা কোথায় যেতে চাই! কিভাবে যেতে পারব! বছরের পর বছর ধরে আশ্বাস আর অবাস্তব স্বপ্নের কথা শোনানো হয়েছে। জনস্বার্থকে উপেক্ষা করা হয়েছে। শাসক রাজনৈতিক দল আর দলীয় প্রধান সব সময় ক্রীড়াঙ্গনকে ব্যবহার করেছেন নিজস্ব স্বার্থে।
স্বাধীনতার পর আমরা এমন এক ক্রীড়াঙ্গন গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম, যেখানে বৈষম্য থাকবে না। ক্রীড়াঙ্গন হবে সমতার।দেশজুড়ে সারা বছর খেলার চত্বরগুলো মুখরিত থাকবে। ক্রীড়াঙ্গনের ড্রাইভিং ফোর্সে থাকবে সুন্দর তারুণ্য। যারা ভয় পায় না স্রোতের বিপরীতে ছুটতে। যারা বড় স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে। বাঁধনহারা তারুণ্য আমাদের নিয়ে যাবে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে তাদের সামর্থ্য ও আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে।
ক্রীড়াঙ্গনে মানবপুঁজি বিনিয়োগ নিয়ে ভাবা হয়নি। এই বিনিয়োগ ক্রীড়াঙ্গনে সঠিকভাবে ক্রীড়াবিদ ও খেলোয়াড় সৃষ্টির জন্য। একটি জাতির উৎপাদনশীল সম্ভাবনার বিকাশ ঘটানোর জন্য। ক্রীড়াঙ্গনে তারুণ্যের অনাবিষ্কৃত শক্তিকে অবমুক্ত করার জন্য।
বর্তমান দুনিয়ায় খেলাধুলা দেশকে পরিচিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। খেলাধুলা এখন সম্মানজনক পেশা। আর এটি রেজাল্ট ওরিয়েন্টেড। খেলোয়াড় ও ক্রীড়াবিদের কৃতিত্বের পরিপ্রেক্ষিতে কিভাবে অচেনা দেশ বিশ্বের কাছে পরিচিত হয়, সেটি যেন আমরা সব সময় দেখছি। আন্তর্জাতিক ক্রীড়ামঞ্চে ছোট দেশ আর বড় দেশ বলে কিছু নেই। এ ক্ষেত্রে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হলো কোন দেশ কিভাবে নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে, কে কিভাবে পরিকল্পিতভাবে সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারছে ফলোৎপাদক হিসেবে। বাস্তবায়ন করছে দেশের মানুষের স্বপ্ন।
বিশাল জনসংখ্যা অধ্যুষিত বাংলাদেশ সম্প্রতি কমনওয়েলথ গেমস থেকে শূন্য হাতে ফিরে এসেছে। এতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। বাংলাদেশ থেকে চারটি খেলার ডিসিপ্লিনে অংশ নিয়েছিলেন পুরুষ ও নারী ক্রীড়াবিদরা। তাঁরা জাতি চরিত্রের প্রতিফলন ঘটাতে পারেননি। অথচ ছোট ছোট দেশ, মানচিত্র খুঁজে তাদের অবস্থান নির্ণয় করতে হয়েছে—এমন দেশও পদক জিতেছে।
দেশ ছাড়ার আগে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব জোবায়েদুর রহমান বলেছেন, ‘পদক নিয়ে বাংলাদেশের কোনো প্রত্যাশা নেই। তারা বাস্তবসম্মত ফলের প্রত্যাশাটাই করছে। এমনও হয়েছে, এক ভেন্যুতে সমন্বয় করে চারটি ডিসিপ্লিনে অনুশীলন করতে হয়েছে! এবার শ্যুটিং, আর্চারিও নেই। তাই পদক নয়, আমরা শুধু ভালো একটা ফলের প্রত্যাশা করতে পারি।’
ক্রীড়াবিদরা কতটুকু প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছেন, সেটি তো আমরা বাস্তবতায় লক্ষ করলাম। ক্রীড়াবিদদের দোষ নেই। তাঁদের যতটুকু সামর্থ্য, ততটুকু কেউ কেউ বাস্তবায়িত করতে পেরেছেন, আবার কেউ কেউ সেটিও পারেননি।
ক্রীড়া ফেডারেশন ও অ্যাসোসিয়েশনগুলো পুরো অনুশীলন পর্ব ও গেমসে অংশ নেওয়ার জন্য ক্রীড়াবিদ নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করেছে। তারা না হয় ছিল অ্যাডহক বডি—তাতে কী, কাজ তো করেছে। এখন আবার প্রতিটি ‘রেসপেক্টিভ’ ফেডারেশনে নতুন অ্যাডহক বডি দায়িত্ব নিয়েছে। চলছে হ-য-ব-র-ল খেলা। আত্মঘাতী মোসাহেবি আগে ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে। আবার সেই একই কায়দা অবলম্বন করা হচ্ছে চতুরতার সঙ্গে।
ক্রীড়াপ্রতিষ্ঠানগুলো অকেজো হয়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা। কমে গেছে অভিন্ন স্বার্থের প্রতি মনোযোগ। ক্রীড়াঙ্গনের সংস্কৃতিতে এখনো আগের অস্থিরতা এবং ভীষণ অসহিষ্ণুতা ভর করে আছে। আমরা তো পরিবর্তন চাচ্ছি। চাচ্ছি ক্রীড়াঙ্গনে মৌলিক সংস্কারের কাজগুলো সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমে এগিয়ে যাক। দেশের ক্রীড়াঙ্গনে কিছু সমস্যার সমাধান রাতারাতি সম্ভব নয়। ধৈর্য ধরতে হবে। আর সময় পাওয়া যাবে না—এ ধরনের মানসিকতা থেকে সরে আসতে হবে। বিগত বছরগুলোতে ক্রীড়াঙ্গনে মূল্যবোধ লঙ্ঘিত হয়েছে একদম গোড়া থেকে মাথা পর্যন্ত। ক্রীড়াঙ্গনে বুদ্ধিজীবী হিসেবে যাঁরা পরিচিত, তাঁদের কাজ ক্ষমতার সঙ্গে শুধু সখ্য নয়, বরং ভুলত্রুটিগুলো ধরিয়ে দেওয়া, জনস্বার্থে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিভিন্নভাবে পরামর্শ দেওয়া। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোটাই যেন সততার প্রকৃত পরীক্ষা।
- ট্যাগ:
- মতামত
- আন্তর্জাতিক
- ক্রীড়াঙ্গন