তারুণ্যের শক্তিতে সমৃদ্ধ হোক কৃষি
১২ আগস্ট ২০২৬ বিশ্বব্যাপী পালিত হতে যাচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক যুব দিবস’। যুবসমাজের সম্ভাবনা, তাঁদের অধিকার এবং বিশ্বের নানা সমস্যা সমাধানে তাঁদের অবদানকে স্বীকৃতি দিতে প্রতিবছর জাতিসংঘ এই দিনটি পালন করে। এই বছরের আন্তর্জাতিক যুব দিবসের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘ভিন্ন প্রেক্ষাপট, অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা’।
মূল বক্তব্য হলো, বিশ্বের নানা প্রান্তের তরুণেরা ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে উঠলেও তাঁদের ভবিষ্যৎ স্বপ্ন এবং আকাঙ্ক্ষাগুলো প্রায় একই রকম। উন্নত বা উন্নয়নশীল, যে দেশেরই হোক না কেন, প্রতিটি তরুণই একটি সুন্দর জীবন, মানসম্মত শিক্ষা, উপযুক্ত কর্মসংস্থান, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ এবং একটি টেকসই পৃথিবীর স্বপ্ন দেখে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে আমাদের অর্থনীতির মূল ভিত্তি কৃষিকেন্দ্রিক হওয়া সত্ত্বেও একটা দীর্ঘ সময় ধরে এ দেশের কৃষক এবং কৃষিকাজ উভয়ই চরম অবহেলার শিকার হয়েছে। কৃষিকাজকে নিছকই ‘বাপ-দাদার আদি পেশা’ হিসেবে গণ্য করা হতো, যার ফলে নতুন প্রজন্মের তরুণদের এই খাতের প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। অথচ বিপুল জনগোষ্ঠীর এই দেশটির মানুষের বিশাল খাদ্যের চাহিদা মেটাতে অপরিহার্য ছিল কৃষিতে বিপুল পরিমাণ ফলন। সেই সঙ্গে কৃষকদের আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়াটাও ছিল সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
পরবর্তী সময়ে সরকার ও গণমাধ্যমের লাগাতার প্রচারণার ফলে চিরাচরিত ধান-পাটের চাষাবাদ পেরিয়ে মাছের চাষ, মুরগি পালন এবং নানা ধরনের শাকসবজি উৎপাদনের মধ্য দিয়ে কৃষি খাতে যে বহুমুখীকরণ ও আধুনিক উন্নয়নের যাত্রা শুরু হয়, তার মূল কারিগর ছিল এই দেশের তরুণসমাজ। ঠিক যে মুহূর্ত থেকে শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম কৃষিকাজে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে শুরু করল, মূলত তখন থেকেই আমাদের কৃষি তার মান্ধাতার আমলের ধ্যানধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল।
বর্তমান বাংলাদেশের মানুষের সামগ্রিক পুষ্টির চাহিদা পূরণ ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে কৃষি খাতে এই তরুণদের অবদান আক্ষরিক অর্থেই এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছে। অতীতের দিনগুলোতে গ্রামের দিকে হাঁস-মুরগি কিংবা গরু-ছাগল পালন করাটাকে কৃষকেরা বাড়তি আয়ের একটি সাধারণ মাধ্যম হিসেবেই বিবেচনা করলেও বর্তমানে তরুণেরা পরিকল্পিতভাবে পোলট্রি, গরুর খামার কিংবা মৎস্য খামার গড়ে তুলে নিজেরা তো আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেনই, পাশাপাশি আরও অসংখ্য মানুষের জন্য কর্মসংস্থানেরও দারুণ সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন।
গত ৪৫ বছরে বাংলাদেশে কৃষির যে পটপরিবর্তন আমার দেখার সুযোগ হয়েছে, আর বছর ২০ ধরে বিশ্ব কৃষির যে রূপরেখা দেখে এসেছি, তাতে ভবিষ্যৎ ভাবনার জায়গাটিতে বারবার মনে হয়েছে—শিক্ষিত তরুণদেরই পৃথিবীকে এগিয়ে নিতে প্রস্তুত করতে হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, পোশাকশিল্পসহ অন্যান্য শিল্প নিয়ে আমরা যতটা অগ্রসর হওয়ার কথা চিন্তা করেছি, কৃষিশিল্প নিয়ে ততটা ভাবিনি। আমরা ভেবেছি, কৃষক তাঁর মতো করেই তাঁর নিজের খাদ্যের পাশাপাশি আমাদের খাদ্য উৎপাদন করবেন। আমরা নামমাত্র মূল্যে তা কিনে নেব, যদি উৎপাদন না-ও করতে পারেন, তবে আমদানি করে আনব।
কিন্তু উন্নত বিশ্ব সব সময়ই বুঝেছে, নিজের খাদ্য নিজেদেরই উৎপাদন করতে হবে। তাই তারা কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষিশিল্প নিয়ে ভেবেছে। আমি ২০০৪-০৫ সালে চীন ও জাপানে গিয়ে দেখেছি কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে রাষ্ট্র তাদের কীভাবে তৈরি করেছে, সুযোগ দিয়েছে, সব ধরনের পরিবর্তনের সঙ্গে তাদের খাপ খাইয়ে নিয়ে আধুনিক করে তুলেছে। কৃষিকে একটা সমন্বিত খাত হিসেবে সাজিয়ে নিয়েছে তারা। কৃষকের সঙ্গে বীজ উৎপাদনকারী, সার উৎপাদনকারী, আবহাওয়ার বার্তা প্রদানকারী, শস্যবিমা ও ঋণের জন্য ব্যাংককে যুক্ত করে দিয়েছে। কৃষকের বাজার নিয়ে তাঁকে ভাবতে হয়নি। সব দিক থেকেই সেবা নিশ্চিত করেছে। ফলে কৃষক তাঁর সম্পূর্ণ মনোযোগ ফসল উৎপাদনে দিতে পেরেছেন। নিজের উন্নয়নের কথা ভাবতে পেরেছেন।
আমাদের কৃষক এখন পর্যন্ত নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে জানেন না। জানেন না, বৃষ্টি কখন হবে, কী পরিমাণ সার বা কীটনাশক দিতে হবে। শস্যবিমার সুযোগ সেভাবে পাচ্ছেন না তাঁরা। আমাদের কৃষককে যতক্ষণ পর্যন্ত বীজ-সার-কীটনাশক, তথ্যসেবা, ব্যাংকঋণ, আবহাওয়া বার্তা, বিমা ইত্যাদির সেবা নিশ্চিত না করতে পারব, ততক্ষণ অবধি প্রকৃত কৃষির উন্নয়ন সম্ভব নয়।
- ট্যাগ:
- মতামত
- যুব সমাজ
- কৃষি উৎপাদন
- আন্তর্জাতিক দিবস