জনগণ বারবার প্রতারিত হলেও নীরব থাকে না
লিওন ট্রটস্কি ছিলেন অক্টোবর বিপ্লবের অন্যতম নেতা। কিন্তু লেনিনের মৃত্যুর পর তিনি ক্ষমতা হারান এবং নির্বাসনে যান। ১৯৩৬ সালে নরওয়েতে নির্বাসিত অবস্থায় তিনি ‘রেভুল্যুশন বিট্রেইড’ নামে একটি বই লেখেন। এটি হলো সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনামূলক গ্রন্থ, যেখানে তিনি দেখান, কীভাবে স্টালিনের আমলে ঘোষিত শ্রমিক শ্রেণির রাষ্ট্র একটি আমলাতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্রে পরিণত হয়েছিল। এটি মূলত মার্কসবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে স্টালিনবাদের বিরুদ্ধে একটি তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ।
ট্রটস্কি বলেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন অর্থনৈতিকভাবে শ্রমিক রাষ্ট্রের চরিত্র বজায় রাখলেও রাজনৈতিকভাবে তার আমলাতান্ত্রিক অবক্ষয় হয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক বিপ্লবের ব্যর্থতার কারণে শ্রমিক শ্রেণি ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এ সুযোগে একটি বিশেষ অধিকারপ্রাপ্ত আমলাতান্ত্রিক শ্রেণি ক্ষমতা দখল করে। এটি স্টালিনবাদের বিরুদ্ধে প্রথম পূর্ণাঙ্গ তাত্ত্বিক সমালোচনা।
ট্রটস্কির মতে, স্টালিনের নেতৃত্বে ‘এক দেশে সমাজতন্ত্র’ নীতি আন্তর্জাতিক বিপ্লবের লক্ষ্যকে পরিত্যাগ করে। এর ফলে সোভিয়েত রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র থেকে সরে গিয়ে একনায়কতান্ত্রিক শাসনে পরিণত হয়। তিনি আরও বলেন, অর্থনৈতিক ভিত্তি সমাজতান্ত্রিক হলেও রাজনৈতিক কাঠামোকে পুনর্গঠন করতে হবে। শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক সোভিয়েত পুনঃপ্রতিষ্ঠা ছাড়া সোভিয়েত ইউনিয়ন হয় ভেঙে পড়বে, নয়তো পুঁজিবাদে ফিরে যাবে। ট্রটস্কির ‘শ্রমিক রাষ্ট্রের অবক্ষয়’ ধারণা পরবর্তী ট্রটস্কিবাদী আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে। বইটি চতুর্থ আন্তর্জাতিক গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরবর্তী সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এ বিশ্লেষণের অনেক দিককে ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণ করে।
রেভুল্যুশন বিট্রেইড শুধু একটি রাজনৈতিক গ্রন্থ নয়, বরং সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র বনাম আমলাতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্রের দ্বন্দ্বের একটি মৌলিক বিশ্লেষণ। ট্রটস্কি দেখিয়েছেন যে, বিপ্লবের সাফল্য টিকিয়ে রাখতে হলে শ্রমিক শ্রেণির সক্রিয় গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ অপরিহার্য।
স্টালিনবাদীরা অবশ্য এ ব্যাখ্যা সমর্থন করেন না। তারা ট্রটস্কিকে কমিউনিজমের শত্রু মনে করেন। ভিন্নমতাবলম্বী কমিউনিস্টদের সম্পর্কে তাদের মুখে অহরহ উচ্চারিত একটি গালি হচ্ছে ‘ট্রটস্কিবাদী’। এ গালি যারা দেন, তাদের বেশির ভাগই বইটি পড়ে দেখেননি। এটা আমাদের জানা, অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাৎপদ সমাজের রাজনীতিও থাকে পশ্চাৎপদ। এখানে গণতন্ত্রের নামে গড়ে ওঠে অলিগার্ক। সামষ্টির শাসনের নামে চালু হয় সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ। এর সহযোগী কিংবা নিয়ামক শক্তি হচ্ছে সিভিল-মিলিটারি আমলাতন্ত্র।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, বিপ্লব বা মুক্তিযুদ্ধের অর্জন টিকিয়ে রাখতে হলে জনগণের সক্রিয় গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ অপরিহার্য। রেভুল্যুশন বিট্রেইড আমাদের শেখায়-যদি জনগণের ক্ষমতা আমলাতন্ত্র বা বিশেষাধিকারপ্রাপ্ত রাজনৈতিক গোষ্ঠীর হাতে চলে যায়, তবে বিপ্লবের লক্ষ্য ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশের জন্য এ শিক্ষা হলো : গণতন্ত্রকে শুধু পাঁচ বছর পরপর নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় আটকে না রেখে রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে জনগণের সচেতন ও স্বাধীন অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হচ্ছে স্থানীয় সরকার, যেটি আমাদের দেশে দাঁড়াতেই পারছে না।
এদেশে একটা মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র, সমতা ও ন্যায়। কেননা পাকিস্তানি এস্টাবলিশমেন্ট এটি দেয়নি। তারা জবরদস্তি করে একটা সিভিল-মিলিটারি আমলা আর বড় পুঁজিপতিদের একটা অলিগার্ক তৈরি করে দেশ শাসন করছিল। দেশের একটি অংশ হয়ে উঠেছিল অভ্যন্তরীণ উপনিবেশ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল তার ফলশ্রুতি। এ দেশের মানুষ যুদ্ধ চায়নি। যুদ্ধটা তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। যুদ্ধ যে কত ভয়ংকর, কত নৃশংস, যে একাত্তর দেখেনি সে বুঝবে না।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বিশ্ব রাজনীতি