সাইবার আইন কতটা সুরক্ষা দেবে মতপ্রকাশকে?
ইন্টারনেট এখন আর আলাদা কোনো জগৎ নয়। আমাদের জীবন, ব্যবসা, শিক্ষা, রাজনীতি, সাংবাদিকতা—সবকিছুরই একটি বড় অংশ এখন অনলাইনে। ফলে সাইবার অপরাধ ঠেকাতে রাষ্ট্রের একটি কার্যকর আইন অবশ্যই প্রয়োজন। প্রশ্ন হলো, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে সেই আইন যেন নাগরিকের কণ্ঠস্বরকেই নিরাপত্তাহীন করে না ফেলে। কারণ একটি রাষ্ট্রের সাইবার পরিসর যতটা নিরাপদ হওয়া জরুরি, তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয় সেই পরিসরে নাগরিক কতটা নির্ভয়ে কথা বলতে পারছেন।
বাংলাদেশে ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ নিয়ে নতুন করে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, সেটি তাই কেবল একটি আইনের সংশোধনীর প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের একটি মৌলিক প্রশ্ন—নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য কোথায়?
বর্তমানে যে সংশোধনী খসড়া নিয়ে আলোচনা চলছে, সেটি এখনো চূড়ান্ত আইন নয়। সরকার খসড়াটি পর্যালোচনা ও সংশোধনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। ২৮ সেপ্টেম্বর গণমাধ্যমের অংশীজনদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত পরামর্শ সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, আইনটির অপপ্রয়োগ সরকার চায় না। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া বা গ্রেফতারের আগে আদালতের অনুমতি নেওয়ার একটি প্রস্তাবও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে গণমাধ্যমের সুরক্ষায় ‘সেভিং ক্লজ’ রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে এবং আরও মতামত নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। কারণ আইন যত শক্তিশালীই হোক, তার প্রয়োগের ধরন যদি অনিশ্চিত হয়, তাহলে সেই আইন মানুষের মনে নিরাপত্তার বদলে ভয়ের জন্ম দিতে পারে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা, নৈতিকতা, আদালত-অবমাননা, মানহানি কিংবা অপরাধে প্ররোচনার মতো নির্দিষ্ট কারণে আইনের মাধ্যমে যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ আরোপের সুযোগও রাখা হয়েছে। অর্থাৎ সংবিধান একদিকে মতপ্রকাশের অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে, অন্যদিকে তার কিছু সীমাও নির্ধারণ করেছে। মূল প্রশ্ন হলো—সেই সীমা কতটা যুক্তিসংগত, প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোও একই ধরনের ভারসাম্যের কথা বলে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে একটি মুক্ত ও গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেছে। তবে এই স্বাধীনতা সীমাহীন নয়; অন্যের অধিকার বা সুনাম, জাতীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, জনস্বাস্থ্য বা নৈতিকতা রক্ষার জন্য কিছু বিধিনিষেধ থাকতে পারে। কিন্তু সেই বিধিনিষেধ হতে হবে আইনে নির্ধারিত, প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক; অতিরিক্ত বিস্তৃত কোনো বিধিনিষেধ গ্রহণযোগ্য নয়—এমন ব্যাখ্যাই দেওয়া হয়েছে।
সাইবার আইনের ক্ষেত্রে এই নীতিটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি ফেসবুক পোস্ট, ইউটিউব ভিডিও, সংবাদ প্রতিবেদন কিংবা ব্যক্তিগত মন্তব্য মুহূর্তেই হাজার বা লাখ মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। ভুল তথ্যের ক্ষতি তাই বাস্তব। মিথ্যা তথ্য দিয়ে কাউকে হয়রানি, প্রতারণা, ভয় দেখানো, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করা হলে তার বিরুদ্ধে আইন থাকা দরকার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি ভুয়া ছবি, ভিডিও ও অডিওর বিস্তারও নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
সরকারও এসব সমস্যা মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। কিন্তু বিপদ শুরু হয় তখনই, যখন ‘ভুল তথ্য’, ‘গুজব’, ‘মানহানি’, ‘হেয়প্রতিপন্ন’ কিংবা ‘আপত্তিকর বক্তব্য’-এর মতো শব্দের সীমানা এত বিস্তৃত হয় যে বৈধ সমালোচনাও তার মধ্যে ঢুকে যেতে পারে। কোনো সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা, কোনো জনপ্রতিনিধির কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন, কোনো প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের তথ্য প্রকাশ কিংবা কোনো নীতির বিরোধিতা—এসব গণতান্ত্রিক সমাজে অপরাধ নয়। বরং ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার সুযোগ না থাকলে জবাবদিহি দুর্বল হয়ে পড়ে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- সাইবার আইন
- সুরক্ষা
- আইন সংশোধন