ডলারের অঙ্ক বাড়ে, শ্রমিকের হিসাব মেলে না
গাজীপুরের এক কারখানার গেটে সকালে একটা কাগজ ঝুলল। উৎপাদন সাময়িক বন্ধ। আট বছর ধরে সেলাই মেশিনে বসা এক নারী শ্রমিক কাগজটা পড়লেন দুবার। তারপর কিছু না বলে ফিরে গেলেন ভাড়া ঘরের দিকে। বকেয়া মজুরি কবে মিলবে, কেউ জানে না। এ বছর ছাঁটাই হওয়া অনেক শ্রমিক এখনো বকেয়া মজুরি ও পাওনা পাননি।
জুলাইয়ের শুরুতে খবর এল অন্য রকম। জুনে দেশের পণ্য রপ্তানি প্রায় ২৬ শতাংশ বেড়ে ৪২০ কোটি ডলারে উঠেছে; শুধু পোশাকখাতে প্রবৃদ্ধি ২১.৫২ শতাংশ। নীতিনির্ধারকেরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন।
একই দেশ, একই খাত, একই সময়। এক দিকে রপ্তানির লাফ, অন্য দিকে কারখানার বন্ধ গেট। দুটো খবরই সত্য। প্রশ্ন হলো, কোনটা আমাদের আসল ছবি?
সংখ্যা যা বলে, আর যা বলে না
আগে সংখ্যাগুলো দেখি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট পণ্য রপ্তানি ছিল ৪৮ বিলিয়ন ডলার, আগের বছরের চেয়ে ০.৫৮ শতাংশ কম। পোশাকখাত আয় করেছে ৩৮.৭০ বিলিয়ন ডলার, প্রায় ১.৬৪ শতাংশ কম। সরকারের ৫৫ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা অনেক দূরে থেকে গেছে। বছরের প্রথম ছয় মাসে পোশাক রপ্তানি কমেছিল ২.৬৩ শতাংশ। কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইনশৃঙ্খলা আর দুর্বল বৈশ্বিক চাহিদা।
তবে ছবিটা একরঙা নয়। নতুন অর্থবছরের জুলাই-অগাস্টে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি ১১.৪২ শতাংশ বেড়ে ১.৬১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, আর অগাস্টে প্রবৃদ্ধি ছিল রেকর্ড ২৫.৬৫ শতাংশ। বাজার তাহলে ফিরছে, অন্তত আংশিক।
আরেকটা তথ্য ভাবার মতো। গত অর্থবছরে প্রবাসী আয় ৩৫.৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে নতুন রেকর্ড গড়েছে। হিসাব কষলে দেখা যায়, রেমিট্যান্স এখন পোশাক রপ্তানির ৯০ শতাংশের বেশি। দেশের ডলার-অর্থনীতি আর একা গার্মেন্টসের কাঁধে ভর দিয়ে নেই। সেই বিবেচনায় ঝুঁকি কমেছে। কিন্তু যে খাতে চাকরির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, সে খাতের ধাক্কা সরাসরি ঘরে ঘরে পৌঁছায়।
ডলার কেন চাকরির মাপকাঠি নয়
রপ্তানির অঙ্ক আর কর্মসংস্থান এক জিনিস নয়। কেন? প্রথমত, একই সংখ্যক শার্ট আগের চেয়ে কম দামে বিক্রি হলে কারখানা একই পরিশ্রমে কম আয় করে। সরবরাহকারীরা বলছেন, ক্রেতারা উৎপাদন খরচ বাড়লেও বেশি দাম দিতে রাজি নন। কিছু কারখানা বন্ধের কারণ হিসেবে পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। তার মানে জাহাজ ভরে যাচ্ছে, কিন্তু মালিকের মার্জিন শুকিয়ে যাচ্ছে। সেই শুকনো মার্জিনের প্রথম শিকার হয় শ্রমিকের ওভারটাইম, তারপর বকেয়া, তারপর চাকরি।
দ্বিতীয়ত, মোট রপ্তানি মানে বড় কারখানা, ছোট কারখানা, সব মিলিয়ে একটা যোগফল। সেই যোগফল স্থিতিশীল থাকলেও ভেতরে কোথাও কারখানা বন্ধ হতে পারে, কোথাও নতুন লাইন খুলতে পারে। যাঁরা চাকরি হারান, তারা যেখানে নতুন কাজ পান, সেই কাজ তাঁদের জন্য নাও হতে পারে। মেশিন-চালিত আধুনিক কারখানায় একই উৎপাদনে কম মানুষ লাগে।
তৃতীয়ত, তথ্যের অভাব প্রকট। কত মানুষ চাকরি হারালেন, এ নিয়ে দেশে সংখ্যার লড়াই চলছে। একটি বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে অন্তত ২০ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই বা ঘাটতির শিকার হয়েছেন। বিজিএমইএর তথ্যে ৮০টি সদস্য কারখানায় ১৯ হাজার ১৮৮ জন ছাঁটাই হয়েছেন এবং তার মধ্যে ২৭টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আরেকটি বিশ্লেষণে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে চারশর বেশি কারখানার স্থায়ী বন্ধের কথা এসেছে; তার ৮৬ শতাংশের কারণ হিসেবে কাজের অভাব ও আর্থিক সংকট দেখানো হয়েছে। আরও বড় একটি হিসাবে এই সময়ে ৪৫৭টি কারখানা বন্ধ এবং প্রায় আড়াই লাখ শ্রমিকের কর্মহীনতার কথা বলা হয়েছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- তৈরি পোশাক শিল্প
- কারখানা শ্রমিক