হামে মৃত্যুর মিছিল আর কত দীর্ঘ হবে
দেশে হামের প্রাদুর্ভাবে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে যে, শিশু আছে—এমন প্রতিটি পরিবার এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। সামান্য সর্দি-জ্বর হলেই হতবিহ্বল হয়ে পড়ছেন অনেকে। চিকিৎসকদের মতে, যে ছয়টি লক্ষণে হাসপাতালে যেতে হবে, সেগুলো উল্লেখ করে এই নিবন্ধ শুরু করছি।
১. রোগীর শ্বাসকষ্ট হলে বা শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হলে, বুকের খাঁচা দেবে গেলে।
২. তরল খাবার বা বুকের দুধ খেতে না পারলে।
৩. বারবার বমি হলে।
৪. খিঁচুনি, নিস্তেজ, তন্দ্রাচ্ছন্ন বা ডাকে সাড়া
না দিলে।
৫. মুখে ঘা, চোখে সমস্যা, চোখ খুলতে না পারলে।
৬. তীব্র পানিশূন্যতা বা অপুষ্টিতে ভুগলে।
এমতাবস্থায় উল্লিখিত লক্ষণগুলো পরিবারের কোনো শিশুর মধ্যে দেখা দিলে আতঙ্কগ্রস্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশে হামের সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাব এখন আর কেবল একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নীতিনির্ধারণ ও জবাবদিহির একটি কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। তিন শতাধিক শিশুর মৃত্যু এবং প্রতিদিন মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকা আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা ও নীতিগত ব্যর্থতার এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরছে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, এই সংকট আকস্মিক নয়—বরং এটি ধারাবাহিক অব্যবস্থাপনা, ভুল সিদ্ধান্ত এবং বিলম্বিত পদক্ষেপের ফল।
প্রথমেই আসতে হয় টিকা সংগ্রহ নীতির প্রশ্নে। দীর্ঘদিন ধরে ইউনিসেফের মাধ্যমে বাংলাদেশে টিকা সরবরাহ একটি নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী প্রক্রিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। এই ব্যবস্থায় বৈশ্বিক ক্রয়ক্ষমতা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার হঠাৎ করে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে টিকা সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেয়, যা বাস্তবে একটি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল। এ প্রসঙ্গে ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত বাংলাদেশ প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়ার ভাষ্যমতে, ইউনিসেফ একাধিকবার অন্তর্বর্তী সরকারের উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেছে এবং প্রতিটি বৈঠকের পর আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে টিকার সম্ভাব্য ঘাটতি, রোগের প্রাদুর্ভাব, জটিলতা বৃদ্ধি এবং মৃত্যুহারের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার এই সতর্কবার্তাকে আমলেই নেয়নি। উল্লেখ্য, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার আগে ইউনিসেফ ও গ্যাভি যৌথভাবে ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট থেকে সংগৃহীত টিকা বাংলাদেশে সরবরাহ করত। কিন্তু গত বছর হঠাৎ এই প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়।
উল্লেখ্য, শেখ হাসিনা সরকার ভয়াবহ করোনা মহামারির সময় ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া থেকে কোভিড-১৯ বা করোনার টিকা এনেছিল। তখন সমাজের ভারতবিরোধী একটা গোষ্ঠী অপপ্রচার চালিয়েছিল যে, সেরামের অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ‘কোভিশিল্ড’ ভ্যাকসিনটি আসলে পানি। ভারতের স্বার্থ রক্ষায় হাসিনা সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে এই টিকা আমদানি করেছে; কেউ যেন এই টিকা গ্রহণ না করে। ভারত বিরোধিতার সূত্রেই কি তবে হামের টিকা আমদানি বন্ধ করেছে ইউনূস সরকার?
যদি তা-ই হয়, তাহলে এ সিদ্ধান্ত কি অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে একটি ভালো নীতি ছিল? অথচ করোনা মোকাবিলায় হাসিনা সরকারের টিকা আমদানি বিষয়ে গৃহীত প্রতিটি উদ্যোগ সারা বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছিল।
ইউনিসেফ ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটসহ ইউরোপ, জাপান ও এশিয়ার বিভিন্ন প্রস্তুতকারকের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি বজায় রাখে, যারা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত টিকা উৎপাদন করে। এসব ব্যবস্থার আওতায় ১৯৭৯ সালে ইপিআই কর্মসূচি শুরুর পর থেকেই ইউনিসেফ সরাসরি এসব প্রস্তুতকারকের কাছ থেকে টিকা সংগ্রহ করে আসছে, যাতে গুণগত মান, নির্ভরযোগ্যতা এবং সর্বনিম্ন দামে সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়। এমন যখন অবস্থা, তখন অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া ক্রয়সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং ক্রয় নীতিমালা পরিবর্তনের ফলেই টিকা সরবরাহব্যবস্থায় ঘাটতি তৈরি হয় এবং যার ফল ভোগ করছে বাংলাদেশ।
- ট্যাগ:
- মতামত
- শিশুর মৃত্যু
- হাম রোগ