চামড়া শিল্পের সুদিন ফেরাতে হবে
আমাদের দেশে কোরবানির ঈদ শুধু ধর্মীয় উৎসবই নয়, এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ মৌসুমি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও কেন্দ্রবিন্দু। এই বিশাল অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো কোরবানির পশুর চামড়া। এবারও ঈদুল আজহাকে ঘিরে হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন, পশু কেনাবেচা, চামড়া শিল্প, পরিবহন, খাদ্য ও গ্রামীণ বাজারব্যবস্থায় ব্যাপক অর্থনৈতিক তৎপরতা অনেকটা দৃশ্যমান ছিল। অবশ্য গত এক দশকে বাংলাদেশ কোরবানির পশু উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। ভারতীয় গরুর ওপর নির্ভরতা েঅনেকটাই কমে গেছে। পরিবর্তে বাংলাদেশি খামারিরাই বাজারের এখন মূল চালিকাশক্তি। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান ও নগদ অর্থপ্রবাহ তৈরি হয়েছে। অথচ আমাদের সম্ভাবনাময় এই খাতটি দীর্ঘদিন ধরে অব্যবস্থাপনা, দামের অস্থিরতা, সিন্ডিকেট, পরিবেশগত সংকটসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত। পশুখাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয়, শ্রমমূল্য ও ঋণের চাপ খামারিদের মুনাফা সংকুচিত করে ফেলেছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার। এর মধ্যে ১ কোটির কিছু বেশি পশু কোরবানি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পশু অবিক্রিত রয়েছে, যা খামারি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় ২২ লাখ পশু উদ্বৃত্ত। একদিকে এটি দেশের প্রাণিসম্পদ খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রমাণ, অন্যদিকে খামারিদের জন্য এটি বড় ঝুঁকিও বটে। কারণ বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হলে পশুর দাম কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, যার প্রভাব সরাসরি পড়বে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের ওপর।
গত কয়েক বছরের মতো এবারও কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে ধস নেমেছে। সরকারের বেঁধে দেওয়া দর মানেননি ট্যানারি মালিক ও বড় আড়তদাররা। চামড়ার বাজারগুলো থেকে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক কমে কাঁচা চামড়া কিনেছেন তারা। ফলে বিভিন্ন স্থান থেকে সংগৃহীত চামড়া বিক্রি করতে এসে মৌসুমি ও ছোট চামড়া ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বিভিন্ন মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও এতিমখানা সংশ্লিষ্টরাও পর্যাপ্ত দাম পাননি।
এ কথা মানতেই হবে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমি চক্র তৈরি করে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে কোরবানির পশুর চামড়া। প্রতিবছর সরকার চামড়ার ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ করে দিলেও বাস্তবে সেই দামে চামড়া বিক্রি হওয়ার ঘটনা খুবই বিরল। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কোরবানির পশুর চামড়া সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে বিক্রি হয়েছে, কোথাও কোথাও চামড়া অবিক্রিতও থেকে গেছে। ফলে মৌসুমি এই অর্থনৈতিক খাত আবারও সংকটের মুখে পড়েছে।
বাংলাদেশের চামড়া শিল্প ঐতিহ্যগতভাবে দেশের অন্যতম রপ্তানিমুখী শিল্প। একসময় তৈরি পোশাক শিল্পের পরই বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের অবস্থান ছিল উল্লেখযোগ্য। কিন্তু গত এক দশকে অব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত মান রক্ষা না করা, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা হারানো এবং কাঁচা চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণে দুর্বলতার কারণে এ খাত ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে। প্রশ্ন হলো, প্রতিবছর একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি কেন ঘটছে? বাস্তবতা হলো, সরকার মূল্য ঘোষণা করলেও বাজার ব্যবস্থাপনা, সংগ্রহ নেটওয়ার্ক এবং ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে ঘোষিত মূল্য কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা থাকলেও উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ পর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত না হওয়ায় রপ্তানি আয়ও প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না।
বলা বাহুল্য, দেশে উৎপাদিত মোট কাঁচা চামড়ার প্রায় অর্ধেক আসে কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে। অর্থাৎ, মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই সারা বছরের একটি বড় অংশের কাঁচামাল সংগ্রহ করা হয়। ফলে ঈদের সময় চামড়া সঠিকভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বাজারজাত করা গেলে এটি দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারে। অন্যদিকে সামান্য অব্যবস্থাপনাও পুরো শিল্প খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
প্রতিবছর ঈদের সময় সরকার কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিলেও মাঠপর্যায়ে সেই দাম বাস্তবায়ন হয় না। রাজধানী ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট নির্ধারণ করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে মৌসুমি ব্যবসায়ী কিংবা এতিমখানা ও মাদ্রাসাগুলো ন্যায্যমূল্য পায় না। গ্রামের অনেক এলাকায় দেখা যায়, চামড়া মাত্র কয়েকশ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হন কোরবানিদাতারা। কোথাও কোথাও তো চামড়া ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। এতে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অন্যদিকে দেশের সম্ভাবনাময় একটি সম্পদও নষ্ট হয়। অথচ, এই চামড়া শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে লাখো মানুষের জীবিকা। কাঁচা চামড়া সংগ্রহকারী, মৌসুমি ব্যবসায়ী, ট্যানারি শ্রমিক, পরিবহনকর্মী, জুতা ও ব্যাগ প্রস্তুতকারকÑ একটি বিশাল জনগোষ্ঠী এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে ঈদের সময় অস্থায়ীভাবে বহু মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। কিন্তু বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে এ খাতে স্থিতিশীলতা তৈরি হয়নি। বড় ব্যবসায়ী ও ট্যানারি মালিকদের হাতে বাজার নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত হওয়ায় ছোট ব্যবসায়ীরা প্রায়ই লোকসানের মুখে পড়েন।
- ট্যাগ:
- মতামত
- চলমান সংকট
- চামড়া শিল্প