২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে জাপান সফরের আগে আমি দেশটি সম্পর্কে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। বই পড়েছি, ইউটিউব ডকুমেন্টারি দেখেছি, ওয়েবসাইট ঘেঁটেছি এবং জাপানফেরত বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলেছি। ফলে জাপানে পৌঁছানোর আগে আমার মনে একটি বিশেষ চিত্র তৈরি হয়েছিল—উন্নত প্রযুক্তি, উচ্চশিক্ষার হার, সুশৃঙ্খল নাগরিক জীবন এবং সমৃদ্ধ সংস্কৃতির এক অনন্য দেশ।
বাস্তবে গিয়ে আমি এসবের প্রায় সবই দেখেছি। পরিচ্ছন্ন রাস্তা, সময়ানুবর্তী ট্রেন, কর্মনিষ্ঠ মানুষ, উন্নত অবকাঠামো এবং সামাজিক শৃঙ্খলা সত্যি প্রশংসনীয়। কিন্তু এর পাশাপাশি এমন একটি অনুভূতি আমাকে তাড়া করেছে, যা হয়তো অনেক পর্যটকের চোখ এড়িয়ে যায়।
আমার মনে হয়েছে, জাপানের বহু মানুষের মধ্যে যেন এক ধরনের নীরব ক্লান্তি, চাপা একাকিত্ব এবং অদৃশ্য শূন্যতা কাজ করছে। টোকিওর ট্রেনে আমি দেখেছি অফিসগামী নারী-পুরুষ। অনেকে ট্রেনে বসেই সাজগোজ করছেন, কেউ মোবাইলে ব্যস্ত, কেউ চোখ বন্ধ করে বসে আছেন। তাঁদের মুখে হাসি কম, কথাবার্তা কম। একজন বাংলাদেশি হিসেবে, যেখানে মানুষ সহজে কথা বলে, হাসে এবং সম্পর্ক গড়ে তোলে, সেখানে এই দৃশ্য আমার কাছে কিছুটা যান্ত্রিক মনে হয়েছে।
এক রবিবার টোকিওর একটি উন্মুক্ত বাজারে গিয়ে আমি আরো অবাক হয়েছি। শহরের শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত নাগরিকরা ছোট ছোট স্টল বসিয়ে নিজেদের তৈরি পণ্য বিক্রি করছেন—কেউ কাঠের তৈরি চশমা, কেউ হাতে বানানো স্টিকার, কেউ নিজস্ব রেসিপির খাবার, কেউ শিল্পকর্ম। প্রথমে আমার মনে প্রশ্ন জেগেছিল—এটি কি অতিরিক্ত আয়ের প্রয়োজন, নাকি জীবনের অর্থ খোঁজার একটি প্রচেষ্টা? তবে বিষয়টি একপক্ষীয় নয়। জাপান বিশ্বের অন্যতম উচ্চ সাক্ষরতার দেশ।
তাদের সাহিত্যচর্চার ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। হাইকু কবিতা, উপন্যাস, নাটক, শিল্পকলা এবং সংগীত আজও জাপানি সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জাপান থেকে নোবেলজয়ী সাহিত্যিকও এসেছে। স্কুলে সাহিত্য শিক্ষা বাধ্যতামূলক এবং বই পড়ার সংস্কৃতি এখনো বিদ্যমান।
তাহলে আমি যে অনুভূতি পেয়েছি, সেটি কী? আমার মনে হয়, সেটি অর্থনৈতিক দারিদ্র্য নয়, বরং আধুনিক নগরজীবনের একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, প্রতিযোগিতা, কম জন্মহার, একাকী জীবন এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থা অনেক মানুষকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তুলতে পারে। প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক উন্নতি মানুষের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য আনতে পারে, কিন্তু সব সময় মানসিক প্রশান্তি নিশ্চিত করতে পারে না।
আমি বিশ্বাস করি, একজন প্রকৌশলী, স্থপতি, চিকিৎসক বা প্রশাসক—যে-ই হোন না কেন, তাঁর সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় থাকা জরুরি। প্রযুক্তি মানুষকে দক্ষ করে, কিন্তু সাহিত্য মানুষকে মানুষ করে। গণিত মস্তিষ্ককে শাণিত করে, কিন্তু কবিতা হৃদয়কে জাগ্রত করে। উন্নত সমাজ গঠনের জন্য উভয়েরই প্রয়োজন।