ওল্ড হোম ও ডে-কেয়ার, প্রয়োজনীয়তা নাকি সামাজিক ব্যর্থতা

প্রথম আলো সৈয়দ ফায়েজ আহমেদ প্রকাশিত: ০৭ জুন ২০২৬, ১৯:১৪

‘মা আজ মারা গেলেন, কিংবা হয়তো গতকাল, আমি ঠিক জানি না’, আলবেয়ার কাম্যু রচিত এই লাইনগুলো পৃথিবীর ইতিহাসে যেকোনো উপন্যাসের সবচেয়ে শক্তিশালী শুরু বলে অনেকে অভিমত দেন। অস্তিত্ববাদী কাম্যু আধুনিক সমাজে মানুষে-মানুষে বিচ্ছিন্নতা নিয়ে যে চরম শক্তিশালী বার্তা দেন তা ধ্রুপদি।


সম্প্রতি বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টালমাটাল করা এক ঘটনায় জানা যায়, এক বয়োবৃদ্ধ মা, একাকী এক নোংরা ঘরে মারা গেছেন এবং উনি মারা যাওয়ার অনেক পরে ওনার লাশ উদ্ধার হয়। মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মানুষেরা ওনার প্রতিষ্ঠিত ও প্রতিপত্তিওয়ালা সন্তানদের প্রতি ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে। এর প্রভাবে ওনার এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সন্তানের বদলি হয় বলে জানা গেছে। তবে এ ঘটনায় সন্তানদের বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কাউকে দোষী বা নির্দোষ বানানোর বাইনারি তর্ক এড়িয়ে একে সমাজতাত্ত্বিক লেন্সে দেখা জরুরি।


বাংলাদেশের সমাজ আজ এক অদ্ভুত দ্বিধাবিভক্ত অবস্থানে দাঁড়িয়ে। একদিকে বৈশ্বিক পুঁজিবাদী অর্থনীতির টানে নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের ঢেউ; অন্যদিকে শতাব্দীপ্রাচীন পারিবারিক বন্ধন, ধর্মীয় আদর্শ ও সামষ্টিক মূল্যবোধের শিকড়। এই টানাপোড়েনের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রকাশ ঘটে যখন কেউ বৃদ্ধ মা-বাবাকে ওল্ড হোমে বা শিশুকে ডে-কেয়ারে রাখার কথা বলেন। সমাজ তখন একযোগে নিন্দার আঙুল তোলে। কিন্তু এই নিন্দার পেছনে কী আছে? শুধুই ভালোবাসা, নাকি ক্ষমতা, কাঠামো ও ইতিহাসের জটিল বুনন?


ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট দিয়ে শুরু করা যাক। বাংলার ভূমিব্যবস্থা ও কৃষি অর্থনীতি যৌথ পরিবারকে একটি কার্যকর উৎপাদন একক হিসেবে গড়ে তুলেছিল। মোগল ও ব্রিটিশ আমলে জমিদারি ব্যবস্থায় পরিবারই ছিল সম্পদের ধারক ও বাহক। জমি অবিভক্ত রাখতে হলে পরিবার অবিভক্ত থাকা জরুরি ছিল। ফলে প্রবীণ সদস্যরা ছিলেন কেবল ‘বোঝা’ নন, তাঁরা ছিলেন জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও সম্পদের কেন্দ্রীয় সংরক্ষক।


আর আদিকাল থেকেই একটি কথা প্রচলিত আছে—ইট টেকস আ ভিলেজ টু রেইজ আ চাইল্ড। একটা শিশুকে বড় করার দায়িত্ব পুরো সমাজের। আর পুরোনো সামাজিক কাঠামোতে সেই কাজটাই হতো। একান্নবর্তী পরিবারের দাদি, নানি, চাচি, খালা তো বটেই, পাড়া প্রতিবেশীসহ সবাই মিলে শিশুর বেড়ে ওঠায় ভূমিকা রাখতেন। একক মায়ের ওপর সম্পূর্ণ চাপ পড়ার ধারণাটিই ছিল অনুপস্থিত। অর্থাৎ যৌথ পরিবার ছিল তৎকালীন সমাজের একটি কার্যকর সামাজিক বিমা ব্যবস্থা।


তবে, ব্রিটিশ আমলে ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এবং পরবর্তী সময়ে ১৯৪৭-এর দেশভাগ বাংলার পারিবারিক কাঠামোয় বড় ধাক্কা দেয়। ভিটেমাটি হারানো মানুষ শহরে আসতে বাধ্য হন, কিন্তু মানসিকতায় যৌথ পরিবারের আদর্শ অক্ষুণ্ন থাকে। সমাজের কাঠামো ভেঙে পুঁজিবাদ প্রচুর ফ্রি শ্রমিক তৈরি করল ঠিকই, কিন্তু তাদের জন্য সেফটি নেট দিল না। ফলে এই বিচ্ছিন্নতা ও আদর্শের মধ্যে ফাঁক তৈরি হয়। মানুষ তার পুরোনো সামাজিক কাঠামোর জন্য হাহাকার করতে থাকে; কিন্তু বাধ্য হয় নতুন একক ব্যবস্থায় টিকে থাকার।


ইউরোপ যখন এই টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যায়, তখন এ বিষয়টাকে বিশ্লেষণ করেছিলেন আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের জনক এমিল ডুর্খেইম। তিনি দেখান যে সমাজে দুই ধরনের সংহতি অবস্থান করে; একটি হচ্ছে যান্ত্রিক সংহতি, যাতে মানুষ একই বিশ্বাস ও মূল্যবোধ শেয়ার করে সংযুক্ত থাকে এবং আরেকটি জৈব সংহতি, যাতে বিভিন্নতা ও বিশেষায়িত ভূমিকার মাধ্যমে সমাজ টিকে থাকে।


বাংলাদেশ এখন এই দুইয়ের মাঝামাঝি এক ক্রান্তিকালে। পুরোনো জৈব সংহতির ভিত্তি তথা যৌথ পরিবার ও বৃহত্তর সামাজিক কাঠামোর মূল্যবোধ দুর্বল হচ্ছে, কিন্তু নতুন যান্ত্রিক সংহতির প্রতিষ্ঠান (রাষ্ট্রীয় সামাজিক সুরক্ষা, পেশাদার পরিচর্যা ব্যবস্থা) এখনো শক্তিশালী হয়নি।


আরেক সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বোর্দিওর হ্যাবিটাস তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষের আচরণ ও রুচি তার শ্রেণিগত অবস্থান ও সামাজিকীকরণ থেকে তৈরি হওয়া এক গভীর অভ্যন্তরীণ ছাঁচ থেকে আসে। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজে ‘সন্তান নিজে মানুষ করা’ এবং ‘বাবা-মাকে ঘরে রাখা’ হলো উচ্চ সাংস্কৃতিক পুঁজির প্রতীক।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও