এশিয়ায় অস্ত্র প্রতিযোগিতার ডাক, নতুন বিপদের আলামত
সিঙ্গাপুরে সাম্প্রতিক শাংগ্রি-লা সংলাপে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এশিয়ার মিত্রদেশগুলোকে তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের ৩ দশমিক ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষায় ব্যয় করার আহ্বান জানিয়েছেন। এই আহ্বান ইতিমধ্যেই গোটা অঞ্চলে উদ্বেগ ছড়িয়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এর ফলে শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক প্রতিযোগিতার সূচনা হতে পারে।
কিন্তু এমন প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি আদৌ আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার করবে কি না, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। কারণ, চীনও পাল্টা একই পথে হাঁটতে পারে। ফলে ব্যয় বাড়লেও বাস্তবে নিরাপত্তা বাড়ার বদলে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
চীনের দক্ষিণে ও ভারতের পূর্বে অবস্থিত ১১ সদস্যের সংগঠন আসিয়ান দীর্ঘদিন ধরেই তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ একটি অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। ১৯৭৯ সালের স্বল্পস্থায়ী চীন-ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর থেকে বড় সংঘর্ষ খুব একটা হয়নি। যদিও এই জোটের ভেতরে নানা ধরনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন ও সিঙ্গাপুরের মতো গণতান্ত্রিক দেশ যেমন আছে, তেমনই কম্বোডিয়া, লাওস ও ভিয়েতনামের মতো কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র এবং মিয়ানমারের মতো সামরিক শাসনও রয়েছে।
তবু আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় আসিয়ানই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে।
এই জোটের মূল শক্তি সামরিক ক্ষমতায় নয়, বরং কূটনীতি ও আলোচনায়। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও জাপানের মতো বড় শক্তিগুলোকে সরাসরি সংঘাত থেকে দূরে রাখতে আসিয়ান বরাবরই মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে। ব্রিটিশ নেতা উইনস্টন চার্চিল যেমন বলেছিলেন, মুখোমুখি আলোচনা যুদ্ধের চেয়ে উত্তম—আসিয়ান সেই পথেই এগিয়েছে।
কিন্তু হেগসেথ এই পদ্ধতিকে কার্যত অগ্রাহ্য করেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘আর বেশি সম্মেলনের দরকার নেই, দরকার যুদ্ধক্ষমতা—কম সংলাপ, বেশি জাহাজ, বেশি সাবমেরিন।’ এই বক্তব্য অনেকের কাছেই উদ্বেগজনক।
কারণ, তাঁর এই আহ্বান এশিয়াজুড়ে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু করতে পারে। এমন একটি অঞ্চলে, যেখানে অতীতের শত্রুতা ও সীমান্ত বিরোধ এখনো বিদ্যমান, এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনার পাশাপাশি ভারত ও জাপানের সামরিক প্রস্তুতি বৃদ্ধিও পরিস্থিতিকে জটিল করছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের বিষয়ে যে প্রকাশ্য আলোচনা শুরু হয়েছে, তা এই সম্ভাব্য বিপদেরই ইঙ্গিত দেয়।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই প্রস্তাবের বড় প্রভাব পড়তে পারে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো গড়ে তাদের জিডিপির ২ শতাংশেরও কম প্রতিরক্ষায় ব্যয় করে। সেখানে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছতে হলে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ডকে তাদের ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি বাড়াতে হবে। সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনামের ক্ষেত্রেও ব্যবধান কম নয়। একমাত্র মিয়ানমার ইতিমধ্যেই ৬ দশমিক ৮ শতাংশ ব্যয় করে; তবে সেই সামরিক শক্তি ২০২১ সালে অং সান সু চির সরকার উৎখাতের পর থেকে জান্তার বিরুদ্ধে লড়াই করা জনগণের বিরুদ্ধেই ব্যবহৃত হচ্ছে।
এই অঞ্চলের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবেই বড়। উদাহরণ হিসেবে থাইল্যান্ডে গত এক শতকে ২২টি অভ্যুত্থানের চেষ্টা হয়েছে, যার মধ্যে ১৩টি সফল। ফলে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়লে অনেক দেশে সামরিক বাহিনী আরও শক্তিশালী হয়ে গণতন্ত্রের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
শীতল যুদ্ধের পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া প্রতিরক্ষার বদলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগে জোর দিয়েছিল। আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতির ফলে এই অঞ্চল দ্রুত শিল্পশক্তিতে পরিণত হয় এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষাবাদী নীতি এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাতকে ঘিরে জ্বালানিসংকট এই প্রবৃদ্ধিকে চাপের মুখে ফেলেছে। এই অবস্থায় স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত থেকে অর্থ সরিয়ে প্রতিরক্ষায় ব্যয় বাড়ানো অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা সামাজিক অস্থিরতা। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে কাটছাঁট করে সামরিক ব্যয় বাড়ালে জন–অসন্তোষ বাড়তে পারে। গত বছর থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার সীমান্ত সংঘর্ষ দেখিয়েছে, অভ্যন্তরীণ চাপ অনেক সময় আঞ্চলিক উত্তেজনায় রূপ নেয়। সরকারগুলো তখন জাতীয়তাবাদকে উসকে দিয়ে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরানোর চেষ্টা করে।