শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈষম্য: শহর ও গ্রামের ব্যবধান কেন বাড়ছে?
রাকিব কুড়িগ্রামের একটি প্রত্যন্ত গ্রামের নবম শ্রেণির ছাত্র। তার স্কুলে কোনো বিজ্ঞানাগার নেই, লাইব্রেরি বলতে কয়েকটি পুরোনো বই। বর্ষাকালে স্কুলে যেতে হলে তাকে কাদা আর পানির মধ্যে দিয়ে হেঁটে যেতে হয়। শিক্ষক সংখ্যা কম থাকায় অনেক সময় ক্লাস হয় না। বাড়িতে বিদ্যুৎ থাকলেও তা নিয়মিত নয়, আর স্মার্টফোন বা ইন্টারনেটের সুযোগ তার নেই। পড়াশোনার পাশাপাশি তাকে পরিবারের আর্থিক সহায়তার জন্য কাজ করতে হয়। সে ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়, কিন্তু তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ অনিশ্চয়তায় ভরা।
অন্যদিকে ঢাকার একটি স্বনামধন্য ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ছাত্র আরিয়ান সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতায় বেড়ে উঠছে। তার স্কুলে রয়েছে স্মার্ট ক্লাসরুম, আধুনিক ল্যাব, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষক। সে নিয়মিত অনলাইন কোর্স করে, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে পরিকল্পনা করতে পারে। তার পরিবার তাকে সব ধরনের সহায়তা প্রদান করে, ফলে সে পড়াশোনায় পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারে।
এই দুই শিক্ষার্থীর মধ্যে পার্থক্য শুধু সুযোগ-সুবিধার নয়; এটি একটি কাঠামোগত বৈষম্যের প্রতিফলন। একজন যেখানে মৌলিক শিক্ষার জন্য সংগ্রাম করছে, অন্যজন সেখানে উন্নত সুযোগের মাধ্যমে এগিয়ে যাচ্ছে।
নীতিগত সীমাবদ্ধতাও এই ব্যবধান বৃদ্ধির একটি বড় কারণ। শিক্ষানীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে অনেক সময় গ্রামীণ বাস্তবতা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। বাজেট বরাদ্দ ও উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে শহরকেন্দ্রিক প্রবণতা দেখা যায়। ফলে গ্রামীণ শিক্ষাব্যবস্থা কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত থাকে। এছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবও একটি বড় সমস্যা।
দুই.
বাংলাদেশে শিক্ষা খাতকে দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্বাধীনতার পর থেকে সরকার প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, উপবৃত্তি প্রদান এবং নারী শিক্ষার প্রসারে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এসব উদ্যোগ দেশের সামগ্রিক সাক্ষরতার হার বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু এই অগ্রগতির মাঝেও একটি গভীর ও ক্রমবর্ধমান সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠছে—শহর ও গ্রামের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে বৈষম্য দিন দিন বাড়ছে। এই বৈষম্য শুধু শিক্ষার মান বা সুযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্ভাবনা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে।
শহরের একটি আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা যে সুযোগ-সুবিধা পায়, তা গ্রামীণ এলাকার অনেক শিক্ষার্থীর কাছে কল্পনাতীত। উন্নত অবকাঠামো, ডিজিটাল ক্লাসরুম, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, সহশিক্ষা কার্যক্রম—সব মিলিয়ে শহরের শিক্ষার্থীরা একটি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে বেড়ে ওঠে। অন্যদিকে, গ্রামের অনেক বিদ্যালয়ে এখনও মৌলিক সুবিধার অভাব রয়েছে। এই বৈষম্য একটি দ্বৈত শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করেছে, যেখানে একই দেশের শিক্ষার্থীরা সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতায় বড় হচ্ছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- গ্রাম
- শহর
- বৈষম্য
- শিক্ষা ব্যবস্থা