রাজনৈতিক অনৈক্য এবং নির্বাচনী সংঘাত
সব ঠিক থাকলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়, বরং এটি ১৬ জুলাই ও ৫ আগস্টের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে অর্জিত দ্বিতীয় স্বাধীনতার সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক চূড়ান্ত অগ্নিপরীক্ষার দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দীর্ঘ দেড় দশকের জগদ্দল একদলীয় শাসন, প্রাতিষ্ঠানিক ফ্যাসিবাদ এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শৃঙ্খল ভাঙতে এ দেশের ছাত্র-জনতা যে অকাতরে রক্ত দিয়েছে, সেই আত্মত্যাগের সার্থকতা আজ একটি সুতোয় ঝুলে আছে। প্রশ্ন উঠেছে—একটি শান্তিপূর্ণ, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে কি আমরা নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি গড়তে পারব? নাকি আমাদের অভ্যন্তরীণ অনৈক্য ও প্রতিহিংসার রাজনীতি প্রকারান্তরে সেই পরাজিত ফ্যাসিস্ট শক্তির প্রত্যাবর্তনের পথকেই প্রশস্ত করে দিচ্ছে? বর্তমান নির্বাচনী উত্তাপ ও মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা আমাদের এক গভীর ও অন্ধকার উদ্বেগের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রধান শর্ত হলো ভয়হীন পরিবেশ। কিন্তু বর্তমান নির্বাচনী প্রচারণার ডামাডোলে আমরা লক্ষ্য করছি সেই পুরনো আধিপত্যবাদী ও সংঘাতময় আচরণের নির্লজ্জ পুনরাবৃত্তি। ৩০ জানুয়ারি ২০২৬-এর বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদপত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করলে এক শিউরে ওঠা চিত্র ফুটে ওঠে। নিউজ পোর্টাল জাগো নিউজ ২৪-এর বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর মাত্র ৪৫ দিনে (১২ ডিসেম্বর থেকে ২৬ জানুয়ারি) সারাদেশে অন্তত ১৪৪টি বড় ধরণের সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। সবচেয়ে বেদনাবিধুর ও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, ভোটের মূল লড়াই শুরু হওয়ার আগেই রাজনীতির মাঠ ৪ জন কর্মীর রক্তে রঞ্জিত হয়েছে।
প্রথম আলো-র প্রতিবেদনে উঠে এসেছে শেরপুরের শ্রীবরদীতে জামায়াত নেতা রেজাউল করিমকে যেভাবে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়। এই ধরণের পৈশাচিকতা প্রমাণ করে যে, ফ্যাসিবাদের পতন ঘটলেও এর রোপিত বিষবাষ্প আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখনো মিশে আছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরা বাংলাদেশের এই পরিস্থিতিকে ‘ফ্রাইটেনিং সিচুয়েশন’ বা ভয়াবহ হিসেবে অভিহিত করেছে। যখন বৈশ্বিক গণমাধ্যম আমাদের গণতান্ত্রিক উত্তরণকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তখন বুঝতে হবে সংকটের গভীরতা কতখানি। কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর ও ময়মনসিংহের মতো জনপদগুলো আজ সংঘাতের ‘হটস্পটে’ পরিণত হয়েছে। এখন টিভি-র তথ্যমতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইতিমধ্যেই ৩৮ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—নিজেদের মধ্যে পরিবর্তন না আসলে, ‘কেবল বন্দুকের নল’ বা ‘বুটের শব্দ’ দিয়ে কি এই আদর্শিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত থামানো সম্ভব?
ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তির মধ্যকার ফাটলই হবে ফ্যাসিবাদের ফেরার সবচেয়ে সহজ সুড়ঙ্গ। যে দলগুলো রাজপথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্বৈরাচারের বুলেট মোকাবিলা করেছিল, আজ ক্ষমতার অলীক মোহে তারা একে অপরের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের পবিত্র রক্তের সাথে এক ধরণের চরম বিশ্বাসঘাতকতা।
ফ্যাসিবাদ কেবল একটি শাসনকাল নয়, এটি একটি পদ্ধতি। যখন একজন নেতা অন্য দলের নেতাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন বা উসকানিমূলক ভাষায় জনসভা গরম করেন, তখন তিনি মূলত ফ্যাসিবাদের সেই পুরনো চাদরই গায়ে জড়ান। নেতাদের এই ‘আক্রোশমূলক বক্তৃতা’ বা ‘হেইট স্পিচ’ আজ মাঠপর্যায়ের সাধারণ কর্মীদের বেপরোয়া ও সহিংস করে তুলছে। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, ফ্যাসিবাদের প্রেতাত্মারা এখনো প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে এবং সমাজের সুবিধাভোগী শ্রেণিতে ঘাপটি মেরে আছে। তারা এই সুযোগেরই অপেক্ষায় আছে—কখন আমরা নিজে নিজেরা সংঘাতে লিপ্ত হব এবং তারা বিশ্বদরবারে ‘গণতন্ত্র ব্যর্থ’ বলে চিৎকার করার সুযোগ পাবে।
এই নির্বাচনী অস্থিরতা কেবল অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই নয়, এর পেছনে গভীর ভূ-রাজনৈতিক চক্রান্ত সক্রিয়। আমার লেখা ‘পাহাড় থেকে সেনা হটাও আন্দোলনের নেপথ্যে’ (রূপালী বাংলাদেশ) এবং ‘রোহিঙ্গা সংকট ও জাতীয় নিরাপত্তা’ (কালের কণ্ঠ) প্রবন্ধগুলোতে আমি বিস্তারিত দেখিয়েছি কীভাবে আমাদের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করার আন্তর্জাতিক খেলা চলছে।
বর্তমান নির্বাচনের অস্থিরতাকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি বা রাঙ্গামাটির মতো এলাকায় ব্যক্তিগত ভূমি বিরোধ বা ক্ষুদ্র সংঘাতকে ‘সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা’র রূপ দেওয়ার একটি সূক্ষ্ম ও সুপরিকল্পিত নীল নকশা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যদি রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে সৌহার্দ্য বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে পাহাড়ের আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। এর ফলে আমাদের সামগ্রিক জাতীয় সার্বভৌমত্ব এক ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়বে। মনে রাখতে হবে, অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাই বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপের পথ সুগম করে।