গণভোট নিয়ে বিভ্রান্তি বনাম প্রক্রিয়াগত অনুমোদন

www.ajkerpatrika.com অরুণ কর্মকার প্রকাশিত: ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৪৫

দেশে নির্বাচনী আবহ বেশ ভালোভাবেই দেখা যাচ্ছে। জমজমাট প্রচার, শোরগোল তোলা প্রচারণার পাশাপাশি রক্তক্ষয়ী সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। এসব সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটছে। নির্বাচনে বাতিল ঘোষিত প্রার্থিতা পুনরুদ্ধারের জন্য আইনি লড়াই এখনো অব্যাহত আছে। দল এবং জোটের মধ্যে মনোমালিন্যের পাশাপাশি সমঝোতা দেখা গেছে। আগের মতো এবারেও নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের নজির দেখা যাচ্ছে। মোট কথা এবারের নির্বাচনে কী নেই, যা বাংলাদেশের সব নির্বাচন প্রক্রিয়ায় থাকে! এবার কেবল বাড়তি একটি নতুন বিষয়—জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একসঙ্গে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে।


বিষয়টি যেহেতু নতুন এবং এর বিষয়বস্তু বহুমাত্রিক ও জটিল, সেহেতু নির্বাচনী আবহের মধ্যেও এক ভিন্ন অবস্থান নিয়ে আছে এই গণভোট। গণভোট নিয়ে এখন পর্যন্ত যে কথাবার্তা, আলাপ-আলোচনা হচ্ছে, তা জনসাধারণের একটি নির্দিষ্ট অংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই অংশটির অবস্থান মূলত রাষ্ট্র ও সমাজের উপরিকাঠামোতে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার এই গণভোট নিয়ে মহাসমারোহে গণপ্রচারের আয়োজন করে ময়দানে নেমে পড়ায় সাধারণ মানুষ এ নিয়ে কথাবার্তা শোনার চেষ্টা করছে। তবে নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারছে না এখনো। কারণ, যা তারা শুনছে তা যেন তাদেরকে এক বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে।

এই বিভ্রান্তির কারণ, একদিকে সরকারি প্রচারণায় তারা শুনছে যে দেশের চাবি তাদের হাতে। সেই চাবি দিয়ে তালাটা খোলার জন্য ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে হবে। ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলেই তালাটা খুলে যাবে, যে তালাটা বন্ধ করে রেখে যুগ যুগ ধরে তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। এই তালাটা খুললেই তারা সবকিছু পাবে। যদিও এই সবকিছুর মানে যে কী, তা তাদের কাছে একেবারেই স্পষ্ট নয়। তবু প্রাপ্তির আশ্বাস বলে কথা। ভাবতে তো হয়ই। আবার অন্যদিকে তারা শুনছে, ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলেই যে সবকিছু পাওয়া যাবে, দেশে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে, সাধারণ মানুষের সব প্রাপ্তির দরজা খুলে যাবে—এমন দাবি ঠিক নয়। এটি এক অসত্য প্রচার, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা।

এই দুই বিপরীতমুখী বক্তব্য শুনে, দ্বিমুখী টানাপোড়েনের মধ্যে পড়ে মানুষ সাধারণভাবে বিভ্রান্ত। বিভ্রান্তির আরও কারণ হলো, মানুষ সাধারণভাবে সরকারের কথা বিশ্বাস করে কম। তা সে যেকোনো সরকারের ক্ষেত্রেই কথাটি প্রযোজ্য। আর ভোট এলে সরকার এবং রাজনীতিকেরা যেসব কথা বলেন, ওয়াদা করেন, সেগুলোর প্রতি মানুষের বিশ্বাস আরও কম থাকে। কারণ, তাদের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, ভোট পাওয়ার পর সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার কথা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রকৃত প্রাধিকারের মধ্যে থাকে না। তাই উদ্ভূত টানাপোড়েনের মধ্যে মানুষ যার যার নিজস্ব অবস্থান থেকে, নিজেদের মতো করে ভেবে বের করার চেষ্টা করছে যে ‘হ্যাঁ’ ভোট তাদেরকে প্রকৃতই কিছু দেবে কি না বা দিতে পারবে কি না?


তাদের ভাবনা এবং বিশ্লেষণে প্রথমেই আসছে এই গণভোট আয়োজনের প্রেক্ষাপট। এককথায়, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান এই ভোটের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। সেই অভ্যুত্থানের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বৈষম্য নিরসন, দারিদ্র্য ও দুর্নীতির অবসান, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ অনেক বড় বড় কত বিষয়। কিন্তু সেই অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় দেড় বছরের শাসনকালে এর কোনোটিরই সামান্যতম কিছুও জনগণ দেখতে পায়নি। বরং উল্টোভাবে বললে, সুশাসন গেছে নির্বাসনে। তার


স্থলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মবতন্ত্র (মবোক্রেসি), যা একপ্রকার জোর যার মুলুক তার-এর সমপর্যায়ভুক্ত। দেশের সর্বত্র সব সময় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে আছে। এখন তাদের ভাবনা শুধু এইটুকু যে কবে এই অবস্থার অবসান ঘটবে। গণভোট কি এই অবস্থার অবসান ঘটাতে পারবে? যদি পারে, তাহলে জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে সরকার ক্ষমতাসীন হলো, তারা কেন এর বিন্দুমাত্রও করে দেখাতে পারল না!


এরপরে আসি বৈষম্য নিরসনের বিষয়ে। এ বিষয়ে সরকারি-বেসরকারি অনেক তথ্য-উপাত্তই বিভিন্ন সময় জনসমক্ষে আসছে যাতে দেখা যায়, সমাজের সব ক্ষেত্রে, সব স্তরে বৈষম্য কমার পরিবর্তে বেড়েছে এবং বেড়ে চলেছে। যদিও ক্রমবর্ধমান এই বৈষম্য সুদীর্ঘকালের ধারাবাহিকতা। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থানের ফসল অন্তর্বর্তী সরকার তা নিরসনের লক্ষ্যে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ বা উদ্যোগ নিয়েছে বলে দৃশ্যমান হয়নি। বরং তারা কোনো কোনো ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর প্রতি পক্ষপাতিত্ব করে বৈষম্য বাড়িয়েছে। ধনবৈষম্য, মানবৈষম্য, সামাজিক বিভক্তিজনিত বৈষম্য—সবই এই সরকারের শাসন মেয়াদে বৃদ্ধি পেয়েছে।


একইভাবে দারিদ্র্য ও দুর্নীতি অবসানের লক্ষ্যে সংঘটিত জুলাই অভ্যুত্থানের পর এর কোনোটিই কমেনি। দারিদ্র্য বৃদ্ধির স্পষ্ট তথ্য-উপাত্ত সরকারিভাবেই প্রকাশিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানও একই তথ্য জানাচ্ছে। দুর্নীতির হাতবদল হয়েছে মাত্র। অর্থাৎ পুরোনো দুর্নীতিবাজদের স্থলে নতুন দুর্নীতিবাজদের আবির্ভাব ঘটেছে। আর জননিরাপত্তার কথা বললে বলতে হয়, আশির দশকের পরে বাংলাদেশে জননিরাপত্তা পরিস্থিতি আর কখনো বোধ হয় এতটা খারাপ হয়নি। বিগত এক-দেড় দশকে দেশে যে গুম-খুন হয়েছে, তা-ও সারা দেশের বিস্তৃত জনপরিসরে এখনকার মতো আতঙ্ক ছড়াতে পারেনি। যখন গণ-অভ্যুত্থানজাত সরকারই গত প্রায় দেড় বছরে অভ্যুত্থানের ঘোষিত কোনো জনসম্পৃক্ত লক্ষ্যই অর্জন করতে পারেনি, তখন হ্যাঁ ভোট দিলেই যে জনগণ সবকিছু পেয়ে যাবে, শোষণ-নিপীড়ন ও বৈষম্য থেকে দেশ মুক্ত হবে, নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে যাবে, এ কথা বিশ্বাস করা একটু কঠিনই বটে। পরিবর্তনটা আসলে নির্ভর করবে এখনকার মতোই পরবর্তী শাসকের সদিচ্ছা এবং দক্ষতা ও জনপরিসরে বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর।


এবারের গণভোট নিয়ে সর্বোপরি একটি প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এই প্রশ্নের মীমাংসা কোনো দিনও হবে না। সেটি হলো—মোট ৮৪টি বিষয়কে চারটি প্রশ্নের মাধ্যমে হ্যাঁ কিংবা না ভোটে দিয়ে অনুমোদন নেওয়ার প্রক্রিয়া। ৮৪টি বিষয়ের মধ্যে আবার ৪৭টি সাংবিধানিক বিষয়। বাকি ৩৭টিও আইন-বিচারসহ রাষ্ট্রের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের সংস্কার-সংক্রান্ত। কোনো ব্যক্তি এবং রাজনৈতিক দলেরই এসবের বিষয়ে শতভাগ একমত হওয়ার সুযোগ নেই। সে ক্ষেত্রে কীভাবে এই সব বিষয়কে চারটি প্রশ্নে সন্নিবেশিত করে গণভোটে দেওয়া যায়? এইভাবে গণভোটের নামে কোনো বিষয়ের অনুমোদনকে বলা হয় প্রক্রিয়াগত অনুমোদন। মানে মানুষ কী জানে বা না জানে তার চেয়ে বড় কথা আমার দরকার এটার ওপর একটা অনুমোদনের সিলমোহর লাগানো।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও