অস্থির পৃথিবী ও কৌশলগত কূটনীতি

যুগান্তর রাজু আলীম প্রকাশিত: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৫৭

একবিংশ শতাব্দীর এ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বিশ্ব এক অভূতপূর্ব ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের সাক্ষী হচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রাখার মরিয়া চেষ্টা, অন্যদিকে চীন ও রাশিয়ার মতো উদীয়মান শক্তির উত্থান বিশ্বকে একটি নতুন স্নায়ুযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ভেনিজুয়েলা থেকে ইরান এবং ইউক্রেন থেকে মিয়ানমার-প্রতিটি সংঘাতের পেছনে রয়েছে পরাশক্তিগুলোর বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লড়াই। বিশেষ করে আমেরিকা বিশ্বজুড়ে যে বাণিজ্য যুদ্ধ এবং অবরোধের রাজনীতি শুরু করেছে, তা উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্থিতিশীলতাকে তছনছ করে দিচ্ছে। এ বিশৃঙ্খল বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে, যা আমাদের জন্য যেমন সম্ভাবনার, তেমনই চরম ঝুঁকির। এ সংকটময় মুহূর্তে বাংলাদেশের টিকে থাকা এবং জাতীয় স্বার্থরক্ষা করার জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী ও সাহসী কূটনৈতিক রূপরেখা।


বাংলাদেশের বর্তমান অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা এবং সীমান্ত সংকটের প্রেক্ষাপটে আমাদের প্রথম ও প্রধান কৌশল হতে হবে ‘সার্বভৌম নিরপেক্ষতা’। পরাশক্তিগুলোর দ্বন্দ্বে কোনো এক পক্ষ অবলম্বন করা বাংলাদেশের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র যখন ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের মাধ্যমে বাংলাদেশকে তাদের সামরিক বলয়ে টানতে চায়, আবার চীন যখন তার ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বাড়াতে চায়, তখন বাংলাদেশকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিতে হবে। আমাদের কূটনীতি হতে হবে কেবলই ‘বাংলাদেশকেন্দ্রিক’। কোনো নির্দিষ্ট দেশের তল্পিবাহক না হয়ে আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতীয় নিরাপত্তার ভিত্তিতে প্রতিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। এ নিরপেক্ষতা কেবল কাগজে-কলমে নয়, বরং আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্যের বৈচিত্র্যায়নের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে। নির্দিষ্ট কোনো দেশ বা ব্লকের ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সমানতালে সম্পর্ক বজায় রাখা এখন সময়ের দাবি।


যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া বাণিজ্য যুদ্ধ এবং ডলারের আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে বাংলাদেশকে বিকল্প অর্থনৈতিক পথের সন্ধান করতে হবে। বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে সাপ্লাই চেইন বারবার বিঘ্নিত হচ্ছে, যা আমাদের পোশাকশিল্প ও রেমিট্যান্সের ওপর আঘাত হানছে। এ ঝুঁকি কমাতে আঞ্চলিক জোটগুলোকে শক্তিশালী করা জরুরি। বিশেষ করে আসিয়ান এবং বিমসটেক-এর মতো সংগঠনগুলোয় বাংলাদেশের সক্রিয়তা আরও বাড়াতে হবে। ডলারের বিকল্প হিসাবে আঞ্চলিক মুদ্রায় বাণিজ্য করার সম্ভাবনাগুলো খতিয়ে দেখতে হবে। ভারতের সঙ্গে অস্থিরতা নিরসনে এবং মিয়ানমার সীমান্তে উত্তেজনা প্রশমনে এ আঞ্চলিক জোটগুলোকেই ঢাল হিসাবে ব্যবহার করা সম্ভব। মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ আমাদের নিরাপত্তার জন্য যে হুমকি তৈরি করেছে, তা মোকাবিলায় কেবল দ্বিপাক্ষিক আলোচনা যথেষ্ট নয়; বরং আসিয়ান দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক চাপ বলয় তৈরি করতে হবে, যাতে জান্তা সরকার বা বিদ্রোহী গোষ্ঠী-যে পক্ষই ক্ষমতায় থাকুক, তারা বাংলাদেশের সীমান্তে উসকানি বন্ধ করতে বাধ্য হয়।


ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে একটি ‘মর্যাদাপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক নীতি’ অনুসরণ করতে হবে। ভারত আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার, কিন্তু সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস করা চলবে না। সীমান্তহত্যা বন্ধ এবং পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে আন্তর্জাতিক ফোরামে জোরালো অবস্থান নিতে হবে। একই সঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য বাংলাদেশের গুরুত্বকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে হবে। সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে, আধিপত্যের ভিত্তিতে নয়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশি হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে একটি সর্বদলীয় জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যতই মতভেদ থাকুক, জাতীয় স্বার্থ ও বিদেশি চাপের প্রশ্নে সবাইকে এক সুরে কথা বলতে হবে। এটি না হলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো আমাদের অভ্যন্তরীণ ফাটল দিয়ে প্রবেশের সুযোগ পাবে, যা ভেনিজুয়েলা বা লিবিয়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে।


তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের যে আশঙ্কা বিশ্বজুড়ে বিরাজ করছে, তার প্রধান শিকার হতে পারে খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা। বাংলাদেশ একটি আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় বৈশ্বিক অস্থিরতার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। এ ঝুঁকি মোকাবিলায় ‘স্বনির্ভর অর্থনীতি’র দিকে দ্রুত ধাবিত হতে হবে। আমাদের কূটনীতির একটি বড় অংশ হতে হবে জ্বালানি কূটনীতি। কোনো একটি উৎসের ওপর নির্ভর না করে মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া এবং রাশিয়ার মতো বিকল্প উৎসগুলো থেকে জ্বালানি আমদানির কৌশল গ্রহণ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা বিশ্বের নিষেধাজ্ঞার ভয় উপেক্ষা করে দেশের মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিশ্বের অনেক দেশই এখন তাদের জাতীয় স্বার্থে নিষেধাজ্ঞার বাইরে গিয়ে বাণিজ্য করছে, বাংলাদেশকে সেই সাহস দেখাতে হবে। অভ্যন্তরীণভাবে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করে বৈশ্বিক মন্দার ঢেউ সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি এখন থেকেই নিতে হবে।


মিয়ানমার সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি স্থায়ী ক্ষত হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যু এখন কেবল মানবিক সমস্যা নয়, এটি একটি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের সুযোগ নিয়ে সেখানে ভূরাজনৈতিক আধিপত্যের যে লড়াই চলছে, তাতে বাংলাদেশকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের কৌশল হতে হবে ‘সক্রিয় প্রতিরোধমূলক কূটনীতি’। মিয়ানমারের সব পক্ষের সঙ্গে, তা সে জান্তা হোক বা আরকান আর্মি-অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগের পথ খোলা রাখতে হবে, যাতে সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) মিয়ানমারের অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকে আরও বেগবান করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র যখন গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে বিভিন্ন দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করে, তখন বাংলাদেশকে মনে করিয়ে দিতে হবে, মিয়ানমারের মতো জায়গায় তাদের প্রকৃত পদক্ষেপের অভাব রয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের দ্বিমুখী নীতির বিরুদ্ধে বিশ্বদরবারে সোচ্চার হওয়া আমাদের নৈতিক ও কৌশলগত দায়িত্ব।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও