শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘ওয়েল-বিয়িং ক্লাব’: সুস্থ প্রজন্ম গড়ার প্রয়াস
একটি গভীর ও বহুমাত্রিক সংকট আজ আমাদের জাতিকে গ্রাস করে ফেলেছে—আর তা হলো মানবিকতার সংকট। ধীরে ধীরে আমাদের ভেতর থেকে মানবিক গুণাবলি ক্ষয়ে যাচ্ছে; সহমর্মিতা, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। আমরা নিজেরাই ভালো ও নৈতিক মানুষ হয়ে ওঠার চর্চা যথাযথভাবে করতে পারিনি, ফলে সেই মূল্যবোধ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াও সম্ভব হয়নি।
এর সবচেয়ে ভয়াবহ প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে আমাদের শিশু ও কিশোরদের জীবনে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে তাদের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও নৈতিক সুস্থতার দিকে প্রয়োজনীয় মনোযোগ দিইনি। পড়াশোনার ফলাফল, পরীক্ষার নম্বর কিংবা প্রতিযোগিতামূলক সাফল্যকে আমরা অগ্রাধিকার দিয়েছি।
কিন্তু মানুষ হিসেবে সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য যে মূল্যবোধ, আবেগগত ভারসাম্য, সামাজিক আচরণ ও নৈতিক শিক্ষা প্রয়োজন—সেগুলোকে উপেক্ষা করেছি। এর ফলেই আজ একটি প্রজন্ম গড়ে উঠছে, যারা তথ্যসমৃদ্ধ হলেও মূল্যবোধে দুর্বল, প্রযুক্তিতে দক্ষ হলেও মানবিকতায় শূন্যতার মুখে দাঁড়িয়ে।
এই সংকটের শিকড় অনুসন্ধান করলে আমাদের ফিরে তাকাতে হয় বাঙালি জাতির দীর্ঘদিনের কিছু মজ্জাগত চারিত্রিক দুর্বলতার দিকে। অযৌক্তিক হুজুগ, একে অপরের পা টেনে ধরার আত্মঘাতী মানসিকতা, কর্মবিমুখ আলস্য এবং কূপমণ্ডূকতা—এই বৈশিষ্ট্যগুলো যুগে যুগে আমাদের জাতিগত বিকাশের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থায় এই চারিত্রিক ত্রুটিগুলো সংশোধনের কোনো রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা তো ছিলই না, বরং শাসকেরা চেয়েছিল আমরা যেন মানসিকভাবে পরাধীন ও আত্মবিশ্বাসহীনই থেকে যাই।
রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা আমাদের সামনে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছিল—নিজেদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও নীতিব্যবস্থার মাধ্যমে একটি বলিষ্ঠ, নৈতিক ও মানবিক জাতি গড়ে তোলার সুযোগ। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই সুযোগ আমরা কাজে লাগাতে পারিনি।
দেশি ও বিদেশি নানা চক্রান্ত, অপসংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ এবং ক্ষমতা ও সম্পদের লোভ আমাদের জাতীয় চারিত্রিক পুনর্গঠনের প্রক্রিয়াকে অঙ্কুরেই ব্যাহত করেছে। দেশপ্রেম, নৈতিকতা ও জনস্বার্থের জায়গায় জায়গা করে নিয়েছে চাটুকারিতা, সুবিধাবাদিতা এবং ব্যক্তিগত লাভের সংস্কৃতি।
এর ফল হিসেবে সমাজে মানুষ ক্রমে ‘মানুষ’ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ছে। এর ধারাবাহিকতা জুলাই অভ্যুত্থানের পরেও অব্যাহত রয়েছে।
এই অবক্ষয়ের পেছনে একটি গভীর কাঠামোগত সংকট কাজ করছে—মানুষ গড়ার তিনটি মৌলিক প্রতিষ্ঠান, অর্থাৎ পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আদর্শিক চ্যুতি। জন্মগতভাবে একটি শিশু নিষ্কলুষ হলেও এই তিন স্তরে বিকৃত মূল্যবোধের সংস্পর্শে এসে তার মানবিক সত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
একসময় পরিবার ছিল নৈতিকতার শ্রেষ্ঠ পাঠশালা। মা-বাবার কাছ থেকেই শিশু শিখত সততা, সহানুভূতি ও দায়িত্ববোধ। আজ সেই পরিবারগুলো পুঁজিবাদী ও ভোগবাদী প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
সন্তানকে শেখানো হচ্ছে কীভাবে অন্যের চেয়ে এগিয়ে যেতে হবে, কীভাবে বেশি নম্বর বা বেশি সম্পদ অর্জন করতে হবে। সহমর্মিতা, ন্যায়বোধ বা মানবিকতার চর্চা সেখানে ক্রমেই গৌণ হয়ে উঠছে।
সমাজের অবস্থাও ভিন্ন নয়। একসময় পাড়া-প্রতিবেশীর বিপদে এগিয়ে আসা বা সমষ্টিগত কল্যাণের চিন্তা ছিল আমাদের সামাজিক সংস্কৃতির অংশ। আজ সেখানে স্থান করে নিয়েছে হিংসা, রেষারেষি এবং অন্যের উন্নতিতে ঈর্ষান্বিত হওয়ার প্রবণতা। সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সমবেত চেতনা দুর্বল হয়ে পড়ায় সমাজ আর মানুষ গড়ার সহায়ক পরিবেশ হিসেবে কাজ করতে পারছে না।
- ট্যাগ:
- মতামত
- মানবিকতা
- অপসংস্কৃতি
- শিক্ষা প্রতিষ্ঠান