বৈশ্বিক অস্থিরতার নাভিকেন্দ্র হয়ে উঠেছে ভেনিজুয়েলা
প্রিয় পাঠক, আজ আমি ভেনিজুয়েলায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দস্যুসুলভ হামলার বিষয়ে লিখব। তার আগে আপনাদের ভাইকিং জলদস্যুদের কাহিনি বলতে চাই। অষ্টম থেকে একাদশ শতাব্দীর শেষ পাদ পর্যন্ত ভাইকিং জলদস্যুরা ছিল সাগর দাপিয়ে বেড়ানো স্ক্যান্ডিনেভিয়ো নর্স জনগোষ্ঠী। তারা একাধারে দস্যুর মতো আক্রমণ চালাত, বাণিজ্য করত এবং অভিযান চালাত।
তাদের ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত থাকত ইউরোপের সমুদ্রতট এলাকার ধনাঢ্য এলাকাবাসী এবং খ্রিষ্টান গির্জাগুলো। তারা ছিল বহুরূপী। তারা ব্যবসা করত, নতুন বসতি গড়ত এবং সাম্রাজ্য গড়ে তুলত। সমুদ্র অঞ্চলে ক্ষমতার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা, বলপ্রয়োগ এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে তারা ইউরোপের ইতিহাসকে বিশেষ ধারায় গড়ে তুলেছে। ভাইকিং শব্দটির অর্থ জলদস্যু। এরা তাদের জাহাজগুলো আক্রমণ করে লুণ্ঠনের জন্য এবং বাণিজ্যের জন্যও ব্যবহার করত।
তারা হামলা চালিয়েছে, ব্যবসা করেছে, নতুন দেশ আবিষ্কার করেছে, নতুন দেশে বসতি গড়েছে এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ রাজা ও পরোপকারী হয়েছে আয়ারল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের মতো দেশে। তারা অন্যদের বাণিজ্যিক জাহাজে এবং সমুদ্র তীরবর্তী ভূমিতে আক্রমণ চালাত। বলপ্রয়োগ করে ধন-সম্পদ ও ক্ষমতা অর্জনই ছিল তাদের লক্ষ্য। সমসাময়িককালের ইউরোপীয় মটাধ্যক্ষরা তাদের ভয়ে তটস্থ থাকত। পঞ্চদশ শতকে পুঁজিবাদের উদ্ভবে ভাইকিং জলদস্যুদের লুণ্ঠিত অর্থ একটি ভূমিকা রেখেছে।
পুঁজিবাদ এমন একটি হিংস্র ব্যবস্থা, যা একবিংশ শতাব্দীতে এসেও ভাইকিং জলদস্যুদের মতো চরিত্র বদলাতে পারেনি। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলায় ‘বৃহৎ পরিসরে’ হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। মাদুরোর সঙ্গে তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকেও নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় স্থানীয় সময় শুক্রবার গভীর রাতে কেঁপে ওঠে ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাস। দেশটির সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি ফোর্ট তিউনা ও বিমান ঘাঁটি লা কারলোভা আক্রান্ত হয়। ভেনিজুয়েলা এ হামলা প্রতিরোধের ঘোষণা দিয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের কথা জানা যায়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত শনিবার স্থানীয় সময় বেলা ১১টায় যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার মার-আলাগোতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘যতক্ষণ না আমরা নিরাপদে, সঠিক ও ন্যায়সংগতভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে পারি, ততক্ষণ আমরা দেশটি (ভেনিজুয়েলা) পরিচালনা করব।’ তিনি আরও বলেন, তারা তাদের বড় তেল কোম্পানিগুলোকে ভেনিজুয়েলায় পাঠাতে যাচ্ছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের দম্ভোক্তি থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ভেনিজুয়েলায় তাদের হামলার আসল উদ্দেশ্য কী। ভেনিজুয়েলায় রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম পেট্রোলিয়ামের মজুত। ভেনিজুয়েলায় একটি সমাজতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর এবং সেই সরকার ভেনিজুয়েলার তেল সম্পদ জাতীয়করণ করার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। সেই থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলাকে শায়েস্তা করার জন্য হেন অস্ত্র নেই, যা তারা প্রয়োগ করেনি। ভেনিজুয়েলার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দেশটির অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়। মূল্যস্ফীতি চরমে ওঠে। সাধারণ মানুষের জীবনে নাভিশ্বাসের সৃষ্টি হয়। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য ছিল ভেনিজুয়েলার অর্থনীতির পঙ্গুদশা ঘটিয়ে দেশটির সমাজতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে সেদেশের জনগণকে খেপিয়ে তোলা। এ লক্ষ্য অর্জনে তারা কিছুটা সফলও হয়।