ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি : বিতর্কের আড়ালে কাঠামোগত সংকট
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. নূরুল ইসলামের একটি বক্তব্যের খণ্ডিত অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকদের মধ্যে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তার ব্যাখ্যাও দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ অনেকেই এ নিয়ে মত দিয়েছেন। কিন্তু আলোচনাটি যে খাতে বইছে-কে বড়, কে ছোট, কার যোগ্যতা কতটুকু-সেটি প্রকৃত প্রশ্নটিকেই আড়াল করে দিচ্ছে। প্রশ্নটি মর্যাদার নয়, কাঠামোর। উপাচার্য যা বলতে চেয়েছেন বলে অনুমান করা যায়, তা ব্যক্তির সামর্থ্য নিয়ে অভিযোগ নয়; বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের কঠিন বাস্তবতার স্বীকারোক্তি। উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক স্তরের পাঠদান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় উত্তরণের জন্য যে ভিন্ন ধরনের প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্কৃতি দরকার, সেটি স্বীকার করা কাউকে খাটো করা নয়।
কেননা বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ-দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রতিষ্ঠান। উইলহেল্ম ফন হুমবোল্ট আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ধারণা দিয়েছিলেন, তার কেন্দ্রে ছিল পাঠদান ও গবেষণার অবিচ্ছেদ্যতা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর যৌথ জ্ঞান-অনুসন্ধান। জন হেনরি নিউম্যানের ধারণায় বিশ্ববিদ্যালয় ছিল জ্ঞানের সঞ্চালনক্ষেত্র, আর ক্লার্ক কারের বিশ্লেষণে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় বহুমাত্রিক এক প্রতিষ্ঠান-যেখানে শিক্ষাদান শুধু একটি কাজ, একমাত্র কাজ নয়। একটি পিএইচডি বা এমফিল তত্ত্বাবধান, পিয়ার-রিভিউড জার্নালে প্রকাশনা, কোর্সওয়ার্ক পরিচালনা, গবেষণা প্রস্তাবনা মূল্যায়ন, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ কার্যক্রম-এগুলো পাঠদানের পরের ধাপ, বাড়তি কাজ নয়, বরং পেশাটির সংজ্ঞার অংশ। এ কাজগুলোর জন্য সময়, অবকাঠামো, তহবিল ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা লাগে। উপাচার্য মূলত এ ওয়ার্কলোডের কথাই বলেছেন। পিয়ের বুর্দিয়ু যাকে ‘একাডেমিক ক্ষেত্র’ বলেছেন, সেখানে প্রতীকী পুঁজি অর্জিত হয় প্রকাশনা, তত্ত্বাবধান ও পাণ্ডিত্যিক স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে; আর আমলাতান্ত্রিক ক্ষেত্রে তা অর্জিত হয় পদসোপান ও জ্যেষ্ঠতার মধ্য দিয়ে। দুটি ক্ষেত্রের মুদ্রা আলাদা বলেই একটির মানদণ্ডে অন্যটিকে মাপা অর্থহীন-এবং সেখানেই বর্তমান বিতর্কের মূল ভ্রান্তি।
- ট্যাগ:
- মতামত
- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম