দক্ষিণ এশিয়ায় জেন-জি ঝড়

যুগান্তর মো. ইলিয়াস হোসেন প্রকাশিত: ২৯ জুলাই ২০২৬, ১১:২১

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন এক প্রজন্মগত শক্তির উত্থান ঘটছে। বাংলাদেশ ও নেপালের পর এবার সেই ঢেউ ভারতের রাজনীতিতেও আঘাত হেনেছে। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটিয়েছে। পরের বছর নেপালেও জেন-জি নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলির সরকার বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছে। আর ভারতের তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপিকেন্দ্রিক আন্দোলন দেশটির জাতীয় রাজনীতিতে এক নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তাতে প্রশ্ন ওঠছে যে ভারত কি পরবর্তী ক্ষেত্র হতে যাচ্ছে?


এ প্রশ্নের সরল উত্তর দেওয়া কঠিন। ভারত কিন্তু বাংলাদেশ নয়, নেপালও নয়। এর আয়তন, জনসংখ্যা, ফেডারেল কাঠামো, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, আঞ্চলিক বৈচিত্র্য এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কিন্তু এটাও সত্য, বাংলাদেশ ও নেপালের আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে যে কয়েকটি লক্ষণ দেখা গিয়েছিল, তার বেশকিছু উপাদান ভারতের আন্দোলনেও দৃশ্যমান। আর এখানেই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।


ভারতের বর্তমান আন্দোলনের জন্ম হয়েছে ডিজিটাল যুগের রাজনৈতিক বিদ্রুপাত্মক একটি শব্দ থেকে। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। পরে বক্তব্যটির ব্যাখ্যা দেওয়া হলেও তত দিনে ‘ককরোচ’ শব্দটি অপমান থেকে প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। সেখান থেকেই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপির উত্থান। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা আমেরিকাপ্রবাসী ভারতীয় নাগরিক অভিজিৎ দীপকের এ আন্দোলন একটি শব্দ বা বিচারপতির মন্তব্যের প্রতিবাদের মধ্যেই আটকে নেই। এর সঙ্গে অনেক অনুষঙ্গ যোগ হয়েছে, সরকারের অদক্ষতার ফল হিসাবে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষা ও নিয়োগ ব্যবস্থার অনিয়ম, কর্মসংস্থানের সংকট, নিজেদের ভবিষ্যৎ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির প্রশ্ন নিয়ে তরুণদের হতাশা ক্রমেই এর মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে। আন্দোলনকারীদের বিভিন্ন দাবির মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ছিল অন্যতম, যা ইতোমধ্যে বিজেপি সরকার মানতে বাধ্য হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন।


বাংলাদেশের ২০২৪ সালের আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে। প্রথমদিকে এটি ছিল মূলত শিক্ষার্থীদের একটি নির্দিষ্ট দাবির আন্দোলন। কিন্তু রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের একটি বিতর্কিত বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্রসমাজের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া এবং আন্দোলন শুরু হয়, যা নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ নেয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক সহিংস প্রতিরোধ করতে গিয়ে ব্যাপক লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল নিক্ষেপ, গ্রেফতার, গুলিবর্ষণসহ অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করে। ফলে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে। এতে সাধারণ আম জনতার মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, যা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষের সঙ্গে এক বিন্দুতে মিলিত হয়ে ছাত্র আন্দোলন বৃহত্তর গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়।


দিল্লির আন্দোলনের ক্ষেত্রে সিজেপি কত বড় সংগঠন, সেটি মুখ্য নয়। বরং প্রশ্ন, তরুণদের ক্ষোভের সঙ্গে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অসন্তোষ যুক্ত হচ্ছে কি না। আন্দোলনের ইতিহাস বলে, ছাত্ররা অনেক সময় স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করে; কিন্তু রাজনৈতিক দাবানল তৈরি হয় তখনই, যখন সাধারণ মানুষ সেই আন্দোলনের মধ্যে নিজেদের বঞ্চনার প্রতিচ্ছবি দেখতে শুরু করে।


নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সাল থেকে ভারতের রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র। সমর্থকদের কাছে তিনি শক্তিশালী ও সিদ্ধান্তপ্রবণ রাষ্ট্রনায়ক; সমালোচকদের কাছে ক্ষমতাকেন্দ্রিক হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রধান মুখ। কিন্তু আজকের প্রশ্ন তার রাজনৈতিক অতীত নয়। প্রশ্ন হলো-ভারতের নতুন প্রজন্মের জমে ওঠা ক্ষোভ তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে কতটা চ্যালেঞ্জ করতে পারে। ২০১৪ ও ২০১৯ সালের নরেন্দ্র মোদি এবং ২০২৬ সালের নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক অবস্থান এক নয়। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি এককভাবে পেয়েছিল ২৪০টি আসন-একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ২৭২টির চেয়ে কম। ফলে মোদির তৃতীয় মেয়াদের সরকার জোট সঙ্গীদের সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল। এখানেই চন্দ্রবাবু নাইডুর টিডিপি, নীতীশ কুমারের জেডি (ইউ) এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আন্দোলন যদি মূলত তরুণদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, জোটের সমীকরণে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। কিন্তু আন্দোলন যদি সর্বভারতীয় জন-অসন্তোষে পরিণত হয় এবং মোদির সঙ্গে থাকা আঞ্চলিক দলগুলো মনে করতে শুরু করে যে, এ সম্পর্ক তাদের নিজেদের নির্বাচনি ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠছে, তখন পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে পারে। অর্থাৎ ভারতের মতো দেশে সরকার পরিবর্তনের জন্য শুধু রাজপথের শক্তি যথেষ্ট নয়, রাজপথের রাজনৈতিক অভিঘাতকে শেষ পর্যন্ত লোকসভার সংখ্যার অঙ্কেও পৌঁছাতে হবে। অন্যদিকে মমতা ব্যানার্জি, অখিলেশ যাদব, এম কে স্ট্যালিন এবং কংগ্রেসসহ বিরোধী শক্তিগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তারা যদি আন্দোলনের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে এর স্বতন্ত্রতা বজায় রাখে, তাহলে আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তি বিস্তৃত হতে পারে। কিন্তু প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো যদি আন্দোলনটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে সিজেপির সবচেয়ে বড় শক্তি-এর স্বতঃস্ফূর্ত জেন-জি পরিচয়-দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও