‘কর্জে হাসানা ব্যাংক’ কেন গুরুত্বপূর্ণ
সুদনির্ভর প্রচলিত ব্যাংকিং কাঠামোর বিপরীতে এক নির্মল, ন্যায়নিষ্ঠ ও শরিয়াহসম্মত বিকল্প ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অবিরাম সাধনায় প্রায় সাত দশকের সুদীর্ঘ পথপরিক্রমায় আধুনিক ইসলামি ব্যাংক-ব্যবস্থা একক আদর্শকে হৃদয়ে ধারণ করে অগ্রসরমাণ।
যখন মুসলিম সমাজ গভীরভাবে অনুধাবন করল যে সুদনির্ভর প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা শরিয়াহর মৌলিক নীতির সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক, তখনই এক ন্যায়ভিত্তিক বিকল্প অর্থনৈতিক কাঠামোর সন্ধানে ইসলামি ব্যাংক-ব্যবস্থার আবির্ভাব ঘটে।
এ ব্যবস্থায় ‘ঋণদাতা-ঋণগ্রহীতা’ সম্পর্কের পরিবর্তে ক্রয়-বিক্রয় ও অংশীদারিভিত্তিক আর্থিক মধ্যস্থতার ধারণা প্রবর্তিত হয়।
এখানে মুদারাবা, মুশারাকা, মুরাবাহা, সালাম ও ইস্তিসনা প্রভৃতি বিনিয়োগ উপকরণের কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমে সুদভিত্তিক ঋণ প্রদানের বিকল্প একটি বাস্তবধর্মী কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে।
তবু এ কথা সততার সঙ্গে স্বীকার করতে হয় যে প্রায় পৌনে এক শতাব্দীর এই অভিযাত্রা সত্ত্বেও ইসলামি ব্যাংকিং মূলত প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের একটি প্রাতিষ্ঠানিক বিকল্প হিসেবেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।
এর মানদণ্ড, কর্মপদ্ধতি ও সাফল্যের মাপকাঠি দীর্ঘদিন ধরে এককভাবে নির্ধারিত হয়েছে এই প্রশ্নে—কতটা দক্ষতার সঙ্গে এটি প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের প্রতিরূপে রূপান্তরিত হতে পেরেছে।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের প্রয়াসে এমন বহু পণ্য ও সেবা উদ্ভাবিত হয়েছে, যা একদিকে শরিয়াহর আনুষ্ঠানিক শর্ত পূরণ করে, অন্যদিকে কার্যত প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের অনুরূপ আর্থিক ফলাফলই নিশ্চিত করে।
বাস্তবতায়, খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরাও নির্দেশ করেন যে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের বহু উপকরণ ও পদ্ধতি যেমন ইজারা ও মুরাবাহা; যা পশ্চিমা প্রচলিত ব্যাংকিং কাঠামোর সমান্তরাল প্রতিরূপ হিসেবে প্রতিভাত হয়।
এ পর্যায়েই এক মৌলিক প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে ওঠে: ইসলামি সভ্যতা যদি বহিঃপ্রভাবমুক্ত থেকে স্বাধীনভাবে নিজস্ব আর্থিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করতে পারত, তবে তার কাঠামো কেমন হতো?
আমার বিবেচনায়, এর উত্তর অনুসন্ধান করতে হবে পুঁজিবাদনির্ভর ব্যাংকিংয়ের সীমানা অতিক্রম করে—সুবিচার, সমতা ও অন্তর্ভুক্তির মতো ইসলামি মূল্যবোধের গভীর শিকড়ে। আর সেই শিকড়ের দুই প্রধান স্তম্ভ হলো, অংশীদারিভিত্তিক ব্যবসা এবং কর্জে হাসানা।
কর্জে হাসানা: ভুলে যাওয়া এক উত্তরাধিকার
‘কর্জে হাসানা’ আরবি শব্দবন্ধটির অর্থ ‘উত্তম ঋণ’, যা মুনাফাবিহীন ও সুদমুক্তভাবে প্রদান করা হয় এবং পুণ্য ও সহানুভূতির কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়।
ইসলামে কর্জে হাসানা হলো অভাবগ্রস্ত মানুষকে নিঃশর্ত, মুনাফাবিহীন ও সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার একটি কল্যাণকর পদ্ধতি।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ-তাআলা একে তাঁর নিজের প্রতি ‘উত্তম ঋণ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং এই মহৎ কাজের বিনিময়ে পার্থিব ও পরকালীন বিপুল প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করেছেন [সুরা আল-বাকারা (২:২৪৫) এবং সুরা আল-হাদিদ (৫৭:১১)]।
রাসুলুল্লাহ (সা.) কর্জে হাসানার সওয়াবকে সদাকার চেয়েও অধিক উল্লেখ করেছেন (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ২৪৩১)।
শতাব্দীর পর শতাব্দী এটি মুসলিম ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক সংহতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিদ্যমান ছিল। ইতিহাসেও এর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। ১৯৬০-এর দশকে মালয়েশিয়ার তাবুং হাজি, মিসরের মিট ঘমর সেভিংস ব্যাংক ও নাসের সোশ্যাল ব্যাংক তাদের কাঠামোয় কর্জে হাসানাকে অন্তর্ভুক্ত করেছিল।
দুঃখজনকভাবে, ১৯৬০-এর দশক থেকে বাণিজ্যিক ইসলামি ব্যাংকিংয়ের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে কর্জে হাসানা ঋণদানের পদ্ধতি হিসেবে অনেকটাই প্রান্তিক হয়ে পড়ে; কারণ, এই মুনাফাবিহীন কর্জ (ঋণ) প্রতিষ্ঠানের জন্য সরাসরি রাজস্ব উৎপন্ন করে না।