জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও খাদ্যনিরাপত্তায় প্রয়োজন জিন ব্যাংক

www.ajkerpatrika.com মৃত্যুঞ্জয় রায় প্রকাশিত: ২৮ জুন ২০২৬, ১১:০৬

উদ্ভিদের জেনেটিক বা কৌলিতাত্ত্বিক বৈচিত্র্য বিশ্বের সামগ্রিক বৈশ্বিক উদ্ভিদ বৈচিত্র্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিশেষ করে কৃষিবৈচিত্র্য, যার সঙ্গে আমাদের রয়েছে সরাসরি খাদ্যের জোগান। এটাই হলো কৃষিবৈচিত্র্যের মূল ভিত্তি। পর্যাপ্ত কৃষিবৈচিত্র্য না থাকলে আমাদের পুরো খাদ্যব্যবস্থাই দ্রুত ধ্বংস হয়ে যাবে। উদাহরণস্বরূপ, ১৮৪৭ সালে আয়ারল্যান্ডে সংঘটিত মহা দুর্ভিক্ষ। এই দুর্ভিক্ষ শুরু হয়েছিল ১৮৪৫ সালে, চলেছিল ১৮৫২ সাল পর্যন্ত। এর মধ্যে ১৮৪৭ সালটি ছিল সবচেয়ে মর্মান্তিক যা ‘কালো ৪৭’ নামে পরিচিত। এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের মূলে ছিল আলুর একটা রোগ ‘লেট ব্লাইট বা মড়ক রোগ’। একধরনের ছত্রাক জীবাণু দ্বারা সংঘটিত সে রোগের কারণে মাঠেই ব্যাপকভাবে আলু দ্রুত পচে নষ্ট হয়ে যায়। তখন আলুই ছিল আয়ারল্যান্ডবাসীর প্রধান খাদ্য। এ কারণে শুধু ১৮৪৭ সালেই সে দেশে প্রায় ৪ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। পুরো দুর্ভিক্ষে মারা যায় প্রায় ১০ লাখ মানুষ। অনেক লোক দেশ ছেড়ে চলে যায়। ফলে সে দেশের জনসংখ্যা প্রায় অর্ধেক কমে যায়। যদি সে সময় আলুর এমন কোনো জাত উদ্ভাবন ও চাষ করা যেত, যেটি আলুর মড়ক রোগপ্রতিরোধী, তাহলে এত মানুষের মৃত্যু ঘটত না। হয়তো সে দেশেই আলুর সে রকম কোনো জাত বা জাতের জিন ছিল যেগুলো ছিল বিজ্ঞানীদের অগোচরে, প্রকৃতিতে। বর্তমানে আলুর মড়করোধী জাত উদ্ভাবিত হয়েছে, কিন্তু সেসব মানুষেরা আর ফিরে আসবে না।


জিনগত বৈচিত্র্য বজায় রাখার মাধ্যমে ‘জিন ব্যাংক’ এ ধরনের বিপর্যয় এড়াতে সাহায্য করে। তা ছাড়া, উদ্ভিদবিজ্ঞানের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে জলবায়ুগত সহনশীলতা ও সংরক্ষণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে কোনো কোনো ফসলকে খরা, বন্যা, লবণাক্ততা ইত্যাদির ক্ষতি থেকে বাঁচানো যায়। এমনকি ঘাতসহনশীলতার পাশাপাশি সেসব ফসলকে পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ করা যায়। এ দেশে ফসলের উৎপাদন তথা হেক্টরপ্রতি অনেক ফসলের ফলন বাড়লেও আমরা এখনো জলবায়ু-ঘাত সহনশীল ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পর্যাপ্তসংখ্যক ফসলের জাত উদ্ভাবন করতে পারিনি। এ দেশেই গোপালগঞ্জের বিলে আছে দেশি ধানের একটি জাত যেটি উফরা রোগ সহনশীল। অথচ জাপান এ রোগ সহনশীল জাত উদ্ভাবনের জন্য সারা পৃথিবী চষে বেড়িয়েছে এরূপ একটি জিনের খোঁজে। কেননা, কৃমিজনিত উফরা রোগই ছিল জাপানে ধান চাষে একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা। আমি জানি না, এরূপ ধানের অফুরন্ত জিন বৈচিত্র্যের বাংলাদেশে জিন ব্যাংকে কতগুলো সংরক্ষিত আছে। থাকলে সেসব জিন আদান-প্রদান এবং ব্যবহার করে কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্যের ফসলের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন করা সহজতর হয়।

জানা গেছে, ফিলিপাইনে অবস্থিত আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের ব্যাংকে আছে ১ লাখ ৩০ হাজার ধানের অ্যাক্সেসন বা জার্মপ্লাজম, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের জিন ব্যাংকে আছে ৯ হাজারের বেশি জার্মপ্লাজম। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ও মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটেরও জিন ব্যাংক আছে। সম্প্রতি সাভারের গণকবাড়িতে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজির অধীনে স্থাপিত হয়েছে জাতীয় জিন ব্যাংক। সে ব্যাংকে থাকবে উদ্ভিদ, প্রাণী ও অণুজীবের জেনেটিক সম্পদ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জার্মপ্লাজম সংগ্রহ, সংরক্ষণ, গবেষণার লক্ষ্যে সেটি তৈরি করেছে। পৃথিবীর বৃহত্তম বীজব্যাংক আছে নরওয়েতে, নাম স্ভালবার্ড গ্লোবাল সিড ভল্ট। এই ব্যাংকে আছে পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বীজের প্রতিলিপিগুলোর দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণব্যবস্থা। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সে ভান্ডারে ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ৫৯১টি নমুনা সংরক্ষণ করা হয়েছে, যা ১৩ হাজার বছরের বেশি কৃষি ইতিহাসকে প্রতিনিধিত্ব করছে।


আজ কোনো কৃষকের কাছে অবহেলায় ফেলে রাখা বীজের মধ্যে যে কী গুপ্তধন লুকিয়ে আছে, তা আমরা কেউ জানি না, বিজ্ঞানীরাই সে রহস্য ভেদ করতে পারবেন। এমনও হতে পারে—সেই ক্ষুদ্র ধান বা সরিসাবীজের ভেতরেই এমন একটি জিন লুকিয়ে আছে, যা হয়তো ভবিষ্যতে সারা পৃথিবীর খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। যদি কোনো মারাত্মক বিপর্যয়ে পৃথিবীর বুকে থাকা সব ধানের বীজ নষ্ট হয়ে যায়? তখন ভবিষ্যতে কৃষক কী দিয়ে চাষ করবেন? কোথায় পাবেন ধানের বীজ? মনে রাখতে হবে, একটি জাত বা বীজ হারিয়ে যাওয়া মানে একটি নাম হারানো না, সেই সঙ্গে অনেকগুলো বৈশিষ্ট্যধারী জিনকেও হারিয়ে ফেলা। যদি সুরক্ষিত জিন ব্যাংকে এসব বীজ সুরক্ষিত থাকে, তাহলে তা থেকেই আবার শুরু করা যাবে চাষাবাদ। তাই জিন ব্যাংক হলো ভবিষ্যৎ খাদ্যনিরাপত্তা ও জীববৈচিত্র্যের চাবিকাঠি।

জিন ব্যাংক স্থাপন ও পরিচালনে কেন বিনিয়োগ করা দরকার? এটি অনেকের প্রশ্ন। এটা কি বিলাসিতা নয়? এর উত্তর সহজ, শুধু এ দেশের জন্যই না, সারা পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য রক্ষা যদি আমরা করতে চাই, তাহলে এটি তার প্রথম পদক্ষেপ। আজ যেসব জীব বা জীবের জাত পৃথিবীতে আছে, ক্রমাগত জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কাল যে সেটি এ পৃথিবীতে থাকবে, এমন কোনো কথা নেই। আমরা আজ যে হাইব্রিড হাইব্রিড করে চিল্লাচ্ছি, তার ভিত্তিও এ দেশের বিভিন্ন ফসলের আদিম জাত বা জার্মপ্লাজমগুলো। কারখানায় নাট-বল্টুর মতো জাত তৈরি করা যায় না। জলবায়ুগত ক্রমাগত বিপর্যয়, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও ভূরাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, যুদ্ধ ইত্যাদি জীববৈচিত্র্য হ্রাস ও খাদ্যনিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। কেবল আজকের জন্য না, ভবিষ্যতের কৃষি ও প্রাণিসম্পদ বৈচিত্র্যকে টিকিয়ে রাখার জন্য সেগুলোর জিন সংরক্ষণ ও সঠিকভাবে তা ব্যবহারের দ্বারা আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা, পরিবেশ, প্রকৃতি, বাস্তুতন্ত্র প্রভৃতিকে রক্ষা করার জন্যই দরকার। মনে রাখা উচিত যে জিন ব্যাংক কোনো বৈজ্ঞানিক সম্পদ নয়, এগুলো যেকোনো দেশের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, যেখানে শত সহস্র কৌলিসম্পদ মজুত থাকতে পারে। এসব জার্মপ্লাজম বা কৌলিসম্পদের একটি মাত্র জিনই আমাদের আয়ারল্যান্ডের মতো মহাদুর্ভিক্ষের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও