সংস্কৃতি, সংগ্রাম ও গণমানুষের কামাল লোহানী

বিডি নিউজ ২৪ অমিত রঞ্জন দে প্রকাশিত: ২৬ জুন ২০২৬, ১২:২২

বেঁচে থাকলে আজ ২০২৬ সালের ২৬ জুন তার ৯২তম জন্মদিন পালিত হতো। বাংলাদেশের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ কামাল লোহানী আমাদের ছেড়ে গিয়েছেন ২০২০ সালের ২০ জুন। তিনি আমাদের মাঝে না থাকলেও তার সংগ্রামী জীবন, সাংস্কৃতিক দর্শন এবং গণমানুষের মুক্তির স্বপ্ন এক উজ্জ্বল স্মৃতি হয়ে আছে।


কামাল লোহানী ছিলেন এমন এক মানুষ, যিনি সংস্কৃতিকে কেবল শিল্পচর্চার বিষয় হিসেবে দেখেননি; তিনি এটিকে গণমানুষের মুক্তি, সামাজিক পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক চেতনা নির্মাণের শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করতেন। তার বিশ্বাস ছিল, সংগঠিত জনগণের চেতনা জাগ্রত না হলে কোনো প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়, আর সেই চেতনা নির্মাণে সংস্কৃতির ভূমিকা অপরিসীম। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি আজীবন গণসংস্কৃতির বিকাশে নিরলসভাবে কাজ করেছেন।


১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশ ঘটে। এরপর সাংবাদিকতা, সংস্কৃতি ও গণআন্দোলনের সঙ্গে তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন। সাংবাদিক হিসেবে বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় দায়িত্ব পালন করলেও তার সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে ওঠে একজন সংস্কৃতি সংগ্রামী হিসেবে। পাকিস্তানি শাসনামলে বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের ওপর যে আঘাত নেমে এসেছিল, তার বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অন্যতম অগ্রসেনানী।


ষাটের দশকে রবীন্দ্রচর্চা ও বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশে ছায়ানটের কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করার ক্ষেত্রে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পরবর্তীকালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী’, যা মুক্তিযুদ্ধের পূর্ববর্তী সময়ে জাতীয়তাবাদী ও মুক্তিকামী চেতনা জাগিয়ে তুলতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। তার নেতৃত্বে সংস্কৃতি হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা, মুক্তির স্বপ্ন এবং সংগ্রামের প্রেরণা।


বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধেও তিনি পালন করেন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক ও বার্তা বিভাগের প্রধান হিসেবে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার কাজে যুক্ত ছিলেন। স্বাধীনতার পর তার কণ্ঠেই দেশবাসী প্রথম বিজয়ের সংবাদ শুনেছিল। এটি শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, একজন সংস্কৃতিকর্মীর দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধের অনন্য দৃষ্টান্ত।


স্বাধীনতার পরও কামাল লোহানীর সংগ্রাম থেমে থাকেনি। তিনি গণশিল্পী সংস্থা, উদীচী, সোমেন চন্দ চর্চা কেন্দ্রসহ অসংখ্য সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে গণসংস্কৃতির বিকাশে কাজ করেছেন। তার কাছে সংস্কৃতি ছিল জনগণের জীবনসংগ্রামের অংশ। তিনি বিশ্বাস করতেন, সংস্কৃতি যদি মানুষের দুঃখ-কষ্ট, স্বপ্ন ও সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত না থাকে, তবে তা সমাজ পরিবর্তনের শক্তি হয়ে উঠতে পারে না।


উদীচীর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি সংগঠনকে নতুন উদ্যমে এগিয়ে নিয়ে যান। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা গণজাগরণ আন্দোলন, সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী সাংস্কৃতিক আন্দোলন কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক শক্তিগুলোর মধ্যে সংহতি গড়ে তোলার উদ্যোগ—সব ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সক্রিয় ও দূরদর্শী নেতৃত্বের প্রতীক। তার নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশীয় সাম্রাজ্যবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী সাংস্কৃতিক কনভেনশন ছিল এ অঞ্চলের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।


বাংলা ভাষার প্রতি তার ভালোবাসা ছিল গভীর। সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করা, ভাষার বিকৃতি রোধ এবং ভাষা-সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য তিনি নিরন্তর কাজ করেছেন। বয়স ও শারীরিক অসুস্থতা কখনো তার কর্মতৎপরতাকে থামাতে পারেনি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি নতুন প্রজন্মের কাছে সংস্কৃতি চর্চার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন এবং সংগ্রামের পথে তাদের অনুপ্রাণিত করেছেন।


কামাল লোহানীর ব্যক্তিত্বের আরেকটি বড় দিক ছিল মানুষের প্রতি তার অগাধ আস্থা। তিনি মনে করতেন, জনগণের শক্তিই ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণ করে। তাই তিনি সবসময় গণমানুষের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন এবং অন্যায়, অসাম্প্রদায়িকতা ও শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেছেন। তার কণ্ঠে, লেখায় এবং কর্মকাণ্ডে বারবার উচ্চারিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

এই সম্পর্কিত

আরও