সর্বজনীন সম্পদ, সম্মিলিত শাসন ও বাজেটের রাজনৈতিক অর্থনীতি
পৃথিবীর অর্থনীতির ইতিহাস চর্চায় একটি বিতর্ক বহু দশক ধরে চলে আসছে—সর্বজনীন সম্পদ কি সর্বদা লুটপাট হওয়ার পথে থাকে? ১৯৬৮ সালে গ্যারেট হার্ডিন তার ‘ট্র্যাজেডি অব দ্য কমনস’ তত্ত্ব দিয়ে বলেছিলেন, সাধারণ মানুষ ব্যক্তিগত স্বার্থে সর্বজনীন সম্পদ অতিব্যবহার করে নষ্ট করে ফেলে। এর সমাধান কী? হয় রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, নয়তো বেসরকারিকরণ।
কিন্তু নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ইলিনর অস্ট্রম এই বাইনারি ভেঙে নতুন তত্ত্ব আমাদের সামনে হাজির করেছিলেন। ২০০৯ সালে প্রথম নারী হিসেবে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান তিনি। তার মতে, সম্প্রদায়গুলো নিজেরাই জটিল সম্মিলিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সর্বজনীন সম্পদ সুচারুভাবে পরিচালনা করতে পারে; রাষ্ট্র বা বাজার—দুটোর কোনোটিই একমাত্র সমাধান নয়। এই তত্ত্বের আলোকে বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পাঠ করলে আমরা একটি গভীর সংকটের চিত্রই দেখতে পাই।
অস্ট্রমের ‘ডিজাইন নীতিমালা’ ও বাংলাদেশের রাজস্ব-কাঠামো
অস্ট্রম বলেছিলেন, টেকসই সর্বজনীন সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য আটটি ডিজাইন প্রিন্সিপাল বা ডিজাইন নীতিমালা থাকতে হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো: স্পষ্ট সীমানা নির্ধারণ (Clearly Defined Boundaries), সবার অংশগ্রহণে নিয়ম-প্রণয়ন (Collective Choice Arrangements) এবং কার্যকর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা (Monitoring)।
বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থাকে অস্ট্রমের কাঠামোয় বিশ্লেষণ করলে বাজেটের ঘাটতি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) মোট রাজস্বের ৮৫ শতাংশের বেশি সংগ্রহ করে; কিন্তু এই সংগ্রহ-প্রক্রিয়ায় করদাতাদের অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণ নেই। নিয়ম তৈরি হয় কেন্দ্রীয়ভাবে, প্রয়োগ হয় কখনো স্বেচ্ছাচারীভাবে এবং জবাবদিহিতা প্রায় অনুপস্থিত। অস্ট্রমের মতে, ‘মনোসেন্ট্রিক’ ব্যর্থতার একটি ক্লাসিক উদাহরণ এটি।
বিকেন্দ্রীকরণের অসম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতি
অস্ট্রমের ‘পলিসেন্ট্রিক গভর্ন্যান্স’ ধারণাটি বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বিশ্লেষণে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছেন, একটি কেন্দ্রীয় সরকার যত ভালোই হোক না কেন, স্থানীয় তথ্য এবং স্থানীয় চাহিদা সে কখনো পূর্ণাঙ্গভাবে জানতে পারে না। তাই সম্পদ বরাদ্দ ও পরিষেবা প্রদানে স্থানীয় ক্ষমতায়ন অপরিহার্য।
বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্থানীয় সরকারের জন্য বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে মোট উন্নয়ন বাজেটের মাত্র ৭.৩ শতাংশ। উপজেলা পরিষদ থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন—সব স্তরেই সম্পদের তীব্র সংকট। ইউনিয়ন পরিষদগুলো কাগজে-কলমে বেশ কিছু ক্ষমতার অধিকারী হলেও আর্থিক স্বাধীনতা না থাকায় সেই ক্ষমতা অর্থহীন। অস্ট্রম যে ‘নেস্টেড এন্টারপ্রাইজ’ (Nested Enterprises) কাঠামোর কথা বলেছেন—যেখানে কেন্দ্র থেকে স্থানীয় স্তর পর্যন্ত ক্ষমতা ও দায়িত্বের সুসংবদ্ধ বিন্যাস থাকে—বাংলাদেশে তা অনুপস্থিত।
পানি সম্পদ: অস্ট্রমের পাঠশালায় একটি বাস্তব ব্যর্থতা
অস্ট্রম তার গবেষণার একটি বড় অংশ ব্যয় করেছেন সেচ ব্যবস্থা বিশ্লেষণে। স্পেন, ফিলিপাইন ও নেপালের মতো বিভিন্ন দেশে তিনি দেখেছেন কীভাবে কৃষকরা নিজেদের মধ্যে চুক্তি করে জটিল সেচ ব্যবস্থা পরিচালনা করেন। এই ব্যবস্থাগুলো অনেক সময় সরকার-নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার চেয়েও অধিক কার্যকর হয়।
বাংলাদেশে পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার চিত্রটি ঠিক এর বিপরীত। হাওর এলাকায় বোরো ধান রক্ষা করার জন্য বাঁধ নির্মাণ থেকে শুরু করে ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার পর্যন্ত—সর্বত্র একটি কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু আছে, যা প্রায়ই স্থানীয় জ্ঞান ও চাহিদাকে উপেক্ষা করে পরিচালিত হয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য বাড়তি বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে; কিন্তু সেই বরাদ্দ স্থানীয় কমিউনিটিভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনার দিকে যাচ্ছে না, যাচ্ছে কেন্দ্রীয় বড় বড় প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে। এতে হাওরের মানুষের দুঃখ দূর হচ্ছে না এবং প্রতি বছরই ফসলহানির ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে। আগামীতেও সেটি দূর হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এর মূলে রয়েছে স্থানীয় জ্ঞানকে উপেক্ষা করে কেন্দ্রীয়ভাবে প্রকল্প গ্রহণ করা। এতে অর্থের অপচয় হলেও কোনো সুফল মিলবে না।