বিশ্বকাপ অর্থনীতি : গোলের সাথে অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশও জড়িত
ব্যাংকের কাউন্টারে বসে থাকা মানুষের কাজই হলো সংখ্যা দেখা, হিসাব মেলানো, ঝুঁকি বোঝা। কিন্তু কখনো কখনো সেই সংখ্যার পেছনে একটা গল্প উঁকি দেয়, যা পুরো একটা দেশের অর্থনৈতিক মানসিকতা বুঝিয়ে দেয় এক লহমায়।
১০ জুন ব্যাংকের কাউন্টারে এক তরুণ গ্রাহক ঋণের আবেদন নিয়ে এলেন। কথার মাঝখানেই তিনি মোবাইল এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘স্যার, দেখুন এই জার্সিটা অর্ডার দিয়েছি, বিশ্বকাপ শুরুর আগেই হাতে চলে আসবে।’
স্ক্রিনে একটা ব্রাজিলের হলুদ জার্সি, দাম আর ডেলিভারির তারিখ। আমি একটু হাসলাম। কারণ ছেলেটা বড় একটি ঋণের আবেদন করতে এসেছে, অথচ এরই মধ্যে জার্সি কিনে ফেলেছে। এটা বাংলাদেশের বিশ্বকাপ-অর্থনীতির একটা নিখুঁত রূপক।
আমরা বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশগ্রহণ করিনি, আয়োজন করিনি, জিতিও না ঠিকই পকেট খালি করি। তবে এই ছোট্ট অর্ডারটার মধ্যে আসলে একটা পুরো বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের গল্প লুকিয়ে আছে। একজন তরুণ বাংলাদেশি ক্রেতা, একটা বিদেশি ব্র্যান্ড, একটা কারখানা, সম্ভবত চট্টগ্রাম বা গাজীপুরেই এবং একটা মহাদেশীয় টুর্নামেন্ট। সব মিলিয়ে একটা সুতো গিয়ে ঠেকছে তার মানিব্যাগে। ততক্ষণে ঋণের কাগজ পড়ে আছে টেবিলে।
মাঠের বাইরে আসল খেলা
আমরা যখন বিশ্বকাপের কথা বলি, প্রথমে মনে আসে মাঠের লড়াই, প্রিয় তারকা, মেসির কান্না বা রোনালদোর বিখ্যাত ‘সিউ (Siu)’ উদযাপন। কিন্তু একজন ব্যাংকারের চোখে এটা ভিন্ন ছবি, সংখ্যার ছবি।
ফিফা ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার যৌথ সমীক্ষা বলছে, ২০২৬ বিশ্বকাপকে ঘিরে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হবে ৮০.১ বিলিয়ন ডলারের। বৈশ্বিক জিডিপিতে যুক্ত হবে ৪০.৯ বিলিয়ন ডলার। সরাসরি কর্মসংস্থান হবে ৮ লাখ ২৪ হাজারের বেশি।
এই সংখ্যাগুলো এত বড় যে মাথায় ঢোকানোই কঠিন। সহজ করে বলি, সোমালিয়ার সারা বছরের বাজেটের চেয়েও বড় অঙ্ক শুধু এই টুর্নামেন্টের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে চলে যাচ্ছে। এমনকি শুধু তিনটি আয়োজক দেশ, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো, মিলিয়ে প্রত্যক্ষ পর্যটন আয় হবে প্রায় ১৪.৮ বিলিয়ন ডলার।
এবার মনে করুন, বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এই মুহূর্তে ২৪ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি। অর্থাৎ একটা টুর্নামেন্ট থেকে পর্যটন আয়ই আমাদের মোট রিজার্ভের অর্ধেকের বেশি। এবার বুঝুন, খেলার মাঠ আর অর্থনীতির মাঠ আসলে কতটা আলাদা।
আমরা কি খালি গ্যালারির দর্শক?
প্রশ্নটা স্বাভাবিক, এত বিশাল একটা টুর্নামেন্ট থেকে বাংলাদেশের মতো দেশ কী পায়? আমরা তো আয়োজক নই, অংশগ্রহণকারীও নই। বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচ আমাদের মাঠে হবে না, ট্রফিও আসবে না আমাদের হাতে। তাহলে কি আমাদের ভূমিকা শুধু টিভির সামনে বসে প্রিয় দলের জন্য চিৎকার করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তর্ক করা আর জার্সি-পতাকা কিনে পকেট হালকা করা?
ব্যাপারটা আসলে এতটা সরল নয়। বিশ্বকাপ শুধু ফুটবলের লড়াই নয়, এটি একই সঙ্গে একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঘটনাও। মাঠের বাঁশি বাজে এক দেশে, কিন্তু তার অর্থনৈতিক প্রতিধ্বনি পৌঁছে যায় হাজার মাইল দূরের অন্য দেশেও। বিশ্বকাপকে অনেকটা স্রোতের মতো বলা যায়; একবার শুরু হলে এর ঢেউ নানা পথ ঘুরে অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
কোথাও তা ব্যবসার সুযোগ তৈরি করে, কোথাও নতুন আয়ের পথ খুলে দেয়, আবার কোথাও বাড়ায় খরচের চাপ। বাংলাদেশের গল্পটাও ঠিক সেরকম, কখনো সুযোগ হয়ে, কখনো চাপ হয়ে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- ফুটবল বিশ্বকাপ
- অর্থনীতিতে প্রভাব