পিতামাতার ভরণপোষণ : আইন ও নৈতিকতা
সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরের এক ফ্ল্যাটে একাকী বসবাসরত এক বৃদ্ধার মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিষয়টি সামনে এসেছে। বৃদ্ধ ও অসহায় পিতামাতার ভরণপোষণ সন্তানের সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ ও বেদনার সঙ্গে বলতে হয়, অনেক সন্তানই এ দায়িত্ব পালন করেন না। শিক্ষিতদের মধ্যে এ প্রবণতা একটু বেশি দেখা যায়। শিক্ষিত ও উপযুক্ত সন্তান থাকার পরও অনেক অসহায় বাবা-মাকে আশ্রয় নিতে দেখা যায় বৃদ্ধাশ্রমে। উপার্জনক্ষম সন্তান থাকা সত্ত্বেও বৃদ্ধ বয়সে পিতামাতাকে যদি বৃদ্ধাশ্রমে দিন কাটাতে হয়, এর চেয়ে হৃদয়বিদারক ও নিষ্ঠুর আর কিছু হতে পারে না। প্রত্যেক সন্তানেরই উচিত বৃদ্ধ পিতামাতার দেখাশোনা ও ভরণপোষণ করা এবং তাদের সঙ্গ দেওয়া।
আমরা জানি, বৃদ্ধ বয়সে যাতে সন্তানের অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার না হন, সেজন্য পিতামাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩ গৃহীত হয়েছে। কোনো সন্তান যদি বৃদ্ধ পিতামাতাকে বাধ্য করে বৃদ্ধাশ্রমে বা অন্য কোথাও বসবাস করতে অথবা কোনো সন্তান যদি পিতামাতার ভরণপোষণ না করে, তাহলে তারা ভরণপোষণের জন্য এ আইনের আশ্রয় নিয়ে তাদের অধিকার আদায় করতে পারেন।
পিতামাতার ভরণপোষণের আইনটি একটি জনকল্যাণকর আইন। এ আইনের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, যেহেতু সন্তান কর্তৃক পিতামাতার ভরণপোষণ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বিধান করা সমীচীন ও প্রয়োজনীয়, সেহেতু আইনটি প্রণয়ন করা হলো। কোনো সন্তান যদি কোনো যুক্তিসংগত কারণে পিতামাতার ভরণপোষণ না করেন, তাহলে তারা ভরণপোষণের জন্য এ আইনের অধীনে লিখিত অভিযোগের মাধ্যমে তাদের অধিকার আদায় করতে পারবেন।
কোনো সন্তান পিতামাতাকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বৃদ্ধাশ্রমে বা অন্য কোথাও একত্রে বা আলাদাভাবে বসবাস করতে বাধ্য করতে পারবে না। প্রত্যেক সন্তানকেই তাদের পিতামাতার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখতে হবে এবং চিকিৎসাসেবা দিতে হবে। পিতামাতা একত্রে বা আলাদা বসবাস করলে প্রত্যেক সন্তানকে সাধ্যমতো তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হবে। পিতামাতা যদি সন্তানের সঙ্গে বসবাস না করেন, তাহলে তারা নিজ নিজ উপার্জন থেকে যুক্তিসংগত পরিমাণ অর্থ দেবে।
আইনটি শুধু পিতামাতার ভরণপোষণ বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এতে পিতামাতার অবর্তমানে দাদা-দাদি ও নানা-নানির ভরণপোষণের ব্যাপারেও জোর দেওয়া হয়েছে। পিতার অবর্তমানে দাদা-দাদিকে এবং মাতার অবর্তমানে নানা-নানিকে পিতামাতার মতো ভরণপোষণ দিতে হবে।
আইনে কেউ অপরাধ করলে তা অবশ্যই আমলযোগ্য। এ আইনের অধীনে করা মামলায় জামিনও পাওয়া যেতে পারে। মামলায় আপস মীমাংসারও সুযোগ রয়েছে। অপরাধের অভিযোগ দায়ের ও বিচার হবে প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে। অপরাধের লিখিত অভিযোগ পিতামাতাকেই করতে হবে। অন্যথায় আদালত তা গ্র্রহণ করবেন না। আদালত সংশ্লিষ্ট অভিযোগের আপস নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বা মেম্বার বা কাউন্সিলর কিংবা অন্য কোনো উপযুক্ত ব্যক্তির কাছে প্রেরণ করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে উভয়পক্ষকে শুনানির সুযোগ দিয়ে তবেই নিষ্পত্তি করতে হবে এবং তখনই তা উপযুক্ত আদালত কর্তৃক নিষ্পত্তি হয়েছে বলে গণ্য হবে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ