পুলিশিং বাস্তবতায় মানবিকতা ও বলপ্রয়োগ

যুগান্তর ড. মো. রুহুল আমিন সরকার প্রকাশিত: ০৫ জুন ২০২৬, ১২:০০

রাষ্ট্র, আইন ও সমাজ-এ তিনটি বিষয় একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। একটি রাষ্ট্র তখনই কার্যকরভাবে পরিচালিত হতে পারে, যখন সেখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত থাকে। আর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো পুলিশ। পৃথিবীর সব দেশেই পুলিশকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হিসাবে গড়ে তোলা হয়েছে। তাদের প্রধান দায়িত্ব হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ প্রতিরোধ, অপরাধীদের গ্রেফতার, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামোকে সুরক্ষিত রাখা।


সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ‘মানবিক পুলিশিং’ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। অনেকেই মনে করেন, পুলিশকে যতটা সম্ভব কোমল, সহনশীল ও মানবিক আচরণ করতে হবে। অন্যদিকে বাস্তবতা হলো, সমাজে এমন একটি শ্রেণি সবসময় বিদ্যমান থাকে, যারা আইন মানতে চায় না, রাষ্ট্রের কর্তৃত্বকে অস্বীকার করে এবং নিজেদের স্বার্থে সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে দিতে প্রস্তুত থাকে। প্রশ্ন হলো, এ ধরনের মানুষদের মোকাবিলায় কি শুধু অনুরোধ, বোঝানো কিংবা নৈতিক উপদেশ যথেষ্ট? নাকি আইন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রায় বলপ্রয়োগও অপরিহার্য?


এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের আবেগ নয়, বরং রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অপরাধবিজ্ঞান, আইন এবং পুলিশবিজ্ঞানের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে হবে। প্রথমেই একটি মৌলিক সত্য স্বীকার করতে হবে। রাষ্ট্রের জন্মই হয়েছে নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য। রাজনৈতিক দার্শনিক টমাস হব্স তার বিখ্যাত সামাজিক চুক্তি তত্ত্বে বলেছিলেন, রাষ্ট্র না থাকলে মানুষের জীবন হয়ে পড়ে ‘solitary, poor, nasty, brutish and short.’ অর্থাৎ রাষ্ট্রহীন সমাজে শক্তিশালীরা দুর্বলদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করবে এবং বিশৃঙ্খলা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে। তাই মানুষ নিজেদের কিছু স্বাধীনতা রাষ্ট্রের হাতে অর্পণ করেছে, যাতে রাষ্ট্র আইন প্রয়োগের মাধ্যমে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।


রাষ্ট্রের সেই ক্ষমতা বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো পুলিশ। পৃথিবীর কোনো দেশেই পুলিশকে শুধু পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তোলা হয়নি। বরং পুলিশকে আইনসম্মত বলপ্রয়োগের বৈধ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে বলা হয় ‘Legitimate Use of Force’ বা বৈধ বলপ্রয়োগ।


বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ভেবার রাষ্ট্রকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বলেছিলেন, রাষ্ট্র হলো সেই প্রতিষ্ঠান, যা একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মধ্যে বৈধ বলপ্রয়োগের একচেটিয়া অধিকার ধারণ করে। অর্থাৎ রাষ্ট্রই একমাত্র প্রতিষ্ঠান যার পক্ষে আইনসম্মতভাবে শক্তি ব্যবহার করা বৈধ। আর সেই শক্তি ব্যবহারের দায়িত্ব বাস্তবে পালন করে পুলিশ এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। বলপ্রয়োগ মানেই অমানবিকতা নয়। বরং আইনসম্মত ও প্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রে মানবিকতারই অংশ। কারণ যখন একজন অপরাধী শত মানুষের জীবন ও নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে, তখন তাকে থামানোই প্রকৃত মানবিকতা। একজন সন্ত্রাসী, ধর্ষক, ডাকাত বা খুনিকে অবাধে চলতে দেওয়া কখনো মানবিকতার পরিচয় হতে পারে না। বরং তা নিরপরাধ মানুষের অধিকারের প্রতি অবহেলা। আধুনিক পুলিশবিজ্ঞানে ‘Use of Force Continuum’ নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা রয়েছে। এর অর্থ হলো, পুলিশ পরিস্থিতি অনুযায়ী ধাপে ধাপে শক্তি ব্যবহার করবে। প্রথমে মৌখিক নির্দেশনা, তারপর নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা, এরপর প্রয়োজন হলে শারীরিক শক্তি এবং সর্বশেষ পর্যায়ে গুরুতর হুমকির ক্ষেত্রে অধিক শক্তি প্রয়োগ। অর্থাৎ বলপ্রয়োগ কখনোই প্রথম বিকল্প নয়, কিন্তু প্রয়োজন হলে এটি বৈধ ও অপরিহার্য। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান-সব দেশেই পুলিশকে বলপ্রয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কারণ এসব দেশের সরকার ও জনগণ জানে, শুধু নৈতিক অনুরোধের মাধ্যমে সব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। মানবাধিকার সূচকে বিশ্বের শীর্ষ অবস্থানে থাকা ইউরোপের দেশগুলোতেও পুলিশ প্রয়োজনে জলকামান, লাঠি, টিয়ারগ্যাস, রাবার বুলেট কিংবা অন্যান্য নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা ব্যবহার করে। যখন কোনো সহিংস জনতা সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করে, জননিরাপত্তা বিপন্ন করে অথবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে চ্যালেঞ্জ করে, তখন পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতেই হয়।


বাংলাদেশের বাস্তবতা এর ব্যতিক্রম নয়। আমাদের দেশে বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, আইন প্রয়োগ করতে গেলেই একটি অংশ সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তারা আইনকে চ্যালেঞ্জ করে, সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর করে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালায়। উদাহরণ হিসাবে মহাসড়কে অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিষয়টি উল্লেখ করা যায়। দীর্ঘদিন ধরে বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন, এসব যানবাহন মহাসড়কে চলাচল করলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। আইন অনুযায়ী এসব যানবাহনের বেশকিছুরই মহাসড়কে চলাচলের অনুমতি নেই। কিন্তু যখন আইন প্রয়োগ করতে যাওয়া হয়, তখন অনেক সময় সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ দেখা যায়। এখানে রাষ্ট্র কী করবে? আইনের প্রয়োগ বন্ধ করে দেবে? নাকি জননিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে? একটি সভ্য রাষ্ট্র কখনোই আইন অমান্যকারীদের চাপের কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারে না। কারণ রাষ্ট্র যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষই। একইভাবে ধর্ষণ, ডাকাতি, সন্ত্রাস কিংবা সংঘটিত অপরাধ দমনের ক্ষেত্রেও বলপ্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও