কিচেন কেবিনেট—ঠাকুর ঘরে কে রে, আমি কলা খাই না
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘কিচেন কেবিনেট’ শব্দটি বর্তমান সময়ের মতো আলোচিত না হলেও এর চর্চা সব সরকারেই ছিল। ছিল মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদের ফিসফাসে কিংবা ইঙ্গিতে। এটি একটি অনানুষ্ঠানিক নীতিনির্ধারক গ্রুপ, যেখানে মূলত সরকারপ্রধানের বিশ্বস্ত বন্ধু এবং ঘনিষ্ঠজনেরা উপস্থিত থাকেন। তারা পর্দার আড়ালে থেকেই সিদ্ধান্ত নেন এবং মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদের নিজেদের থেকে কিছুটা দূরত্বে রাখেন। তারা মূলত ‘অদৃশ্য’ শক্তি হিসেবেই কাজ করেন। তবে বলার অপেক্ষা রাখে না যে, মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এর প্রভাব ছিল নজিরবিহীন।
গেল ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই বাংলাদেশে কমবেশি এই অনুষঙ্গটি আলোচনায় এসেছে। তবে বলে রাখা প্রয়োজন যে, এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলেই কয়েক দিক থেকে কয়েক দফায় শোনা গিয়েছিল যে, সরকারের ভেতরে আরেকটি সরকার আছে আর তারাই মূলত দেশ চালাচ্ছেন। তবে সেই ‘অদৃশ্য সরকার রহস্য’ নিয়ে কানাঘুষা চললেও সর্বপ্রথম কিচেন কেবিনেট নিয়ে কথা বলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শ্রম উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি বেসরকারি টেলিভিশনের সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, সব সরকারেরই একটি ‘কিচেন কেবিনেট’ থাকে, যেমন ছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারেও। তিনি আরও বলেছিলেন, ‘সেখানে এমন কিছু সিদ্ধান্ত হতো, যা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের জানানো হতো সাধারণ বিষয়ে। হয়তো ওই মনোভাবের লোক আমি ছিলাম না। তারা ধরে নিয়েছেন, আমি তাদের সাথে একমত হতে পারব না। যারা এসব করেছেন, তারা পরিচিত। আমি শুধু নাম শুনেছি। তারা আমার সহকর্মী ছিলেন।’ সেই সাক্ষাৎকারে সাবেক এই উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন সরকারের ভেতর একটি ‘কিচেন কেবিনেট’ বা প্রভাবশালী মহলের অস্তিত্বের প্রতি ইঙ্গিত করেছিলেন। তিনি জানান, বড় সিদ্ধান্তগুলো ২৭ জনের উপদেষ্টা পরিষদে আলোচনার আগেই বাইরে নির্ধারিত হয়ে যেত (দৈনিক ইত্তেফাক: ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬)।
তারপর থেকেই মূলত কারা সেই কিচেন কেবিনেটের সদস্য, যারা মুখে গণতন্ত্র অন্বেষণের কথা বলে ‘রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত’ রান্নাঘরের দরজায় নিতেন, সেগুলো নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে বিষয়টি আরও খোলসা হতে শুরু করে যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা ‘হায় হায়’ রব থেকে জবাবদিহির দিকে যায়। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, তখন থেকেই উপদেষ্টারা একে একে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করতে থাকেন। সাবেক উপদেষ্টা ফরিদা আখতারও বলেছেন, তিনি এই চুক্তির বিরোধিতা করেছেন এবং তিনিও এই কিচেন কেবিনেটের সদস্য ছিলেন না। সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বিবিসি নিউজ বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে, তিনিও এই কিচেন কেবিনেটের সদস্য ছিলেন না; যদিও মাঝেমধ্যে আইন সংস্কার বিষয়ে মতামতের জন্য প্রধান উপদেষ্টা তাকে ডাকতেন। অন্যদিকে কিচেন কেবিনেটের সাত সদস্যের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে জনগণ যাকে মনে করা হয়, সেই উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানও নিজের অবস্থান পরিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন। তিনি কিচেন কেবিনেটের কথা পুরোপুরি স্বীকার করেননি, তবে বলেছেন তার সরকারের কিছু ভুল ছিল।
তবে কোরবানির ঈদের আগে আগে মানুষের মাথায় আবার কিচেন কেবিনেট নিয়ে আগ্রহের পোকা ঢুকিয়ে দেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকার পরিচালনায় সাত সদস্যের একটি কিচেন কেবিনেট সক্রিয় ছিল। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো সেখান থেকেই আসত। তারা প্রতি মঙ্গলবার যমুনায় (সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন) বৈঠকে বসতেন। তাদের হস্তক্ষেপ ও মন্ত্রণালয়ের কাজে প্রভাব বিস্তারের কারণে তিনি তিনবার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, কিন্তু সরকারের অস্বস্তির কথা ভেবে তা আর করা হয়নি (দৈনিক প্রথম আলো, ২৬ মে, ২০২৬)। তিনি আরও বলেন যে, ওই কিচেন কেবিনেট যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিসহ নীতিনির্ধারণী সব সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেটি তিনি জানতেন না। তিনি আরও বলেছেন যে, এই চক্রের সদস্যদের অভিজ্ঞতা কম থাকলেও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের মতামতকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হতো। তৌহিদ হোসেনের ওই সাক্ষাৎকারের পর কেচিন কেবিনেট অনুষঙ্গটি নতুন করে আবারও ডালপালা মেলে আলোচনায় এসেছে।
কিচেন কেবিনেট নিয়ে এত সহজ এবং তথ্যনির্ভর আলোচনার পর হাতের আঙুল গুনে গুনে যখন সেই সাত উপদেষ্টার নাম বের করার চেষ্টা করছিলেন অনেকেই, তখনই ‘ঠাকুর ঘরে কে রে, আমি কলা খাই না’—অনেকটা এরকমভাবেই এই কিচেন কেবিনেটের আলোচনার মঞ্চে হাজির হয়েছেন আরেক সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনিও স্বীকার করেছেন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের একটি ‘কিচেন কেবিনেট’ সক্রিয় ছিল। কিন্তু তিনি সেই কেবিনেটের সদস্য ছিলেন না।
ওপরের তথ্যগুলো এত দিনে আমরা কমবেশি সবাই জেনেছি। এখন মনে অনেক প্রশ্ন। সমস্যা হলো আঙুলে সেই সাতজন অনুমেয় উপদেষ্টার নাম গণনা শেষ হওয়ামাত্রই দেখি একজন করে মঞ্চে হাজির হয়ে বলছেন, তিনি কিচেন কেবিনেটের সদস্য নন, তিনিও আমজনতার মতোই শুনেছেন। এখন তাহলে কারা ছিলেন সেই মহাশক্তিশালী কিচেন কেবিনেটের সদস্য? আর যখনই চুক্তির বিষয়টি সামনে এল, তখনই সকলকে ‘তুলসী পাতা’য় আবৃত হতে হচ্ছে কেন? তৌহিদ হোসেন শক্ত কথা বলেছেন, কিন্তু উপদেষ্টা থাকা অবস্থায় তিনি কেন বলতে পারলেন না যে, এমন একটি চুক্তি পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বাদে কীভাবে হয়? আইন উপদেষ্টাই জানেন না কিছুই। কিন্তু চুক্তিতো আইনি বিষয়, তার অজ্ঞাতে কীভাবে এটি হলো? তিনি নিজে এবং অন্য উপদেষ্টারা তখন চুপ করে ছিলেন, মানে তারা সেটি প্রতিবাদ না করে প্রশ্নহীনভাবেই হতে দিয়েছেন? কেউই তখন বলেননি, আমাদের না জানিয়ে কীভাবে এত বড় চুক্তি হচ্ছে? কেন বললেন না? তৌহিদ হোসেনের দাবি, তিনি তিনবার পদত্যাগ করতে চেয়েছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত যে করেননি, তা-তো দেখতে পেলাম আমরা আমজনতা। কিন্তু কেন তিনি পদত্যাগ করতে পারলেন না? ব্রিগেডিয়ার (অব.) সাখাওয়াত হোসেনকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদ ছাড়তে হয়েছিল ৭.৬২ বুলেট নিয়ে প্রশ্ন তোলায়। তার মন্ত্রণালয় পরিবর্তন করা হলো। তবুও তিনি পদ ছাড়েননি। যদিও পরে বলেছেন তখনই তিনি পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমরা দেখেছি তিনি শেষ পর্যন্ত উপদেষ্টা পরিষদে থাকলেন। কেন? তাদের জীবন নিয়ে ভয় ছিল? তারা কি তাদের অন্য সহকর্মীদের ভয় পেতেন? তা না হলে কিচেন কেবিনেটেই যদি বেশিরভাগ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো, তাহলে তাদের কেন উপদেষ্টা করে রাখা হয়েছে? এতে তাদের সম্মানহানি হয়নি?
- ট্যাগ:
- মতামত
- কিচেন ক্যাবিনেট