হাওরের কান্না: প্রাকৃতিক নাকি ভুল পরিকল্পনার খেসারত?
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর আবারও দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার গভীর দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিস্তীর্ণ সবুজ ধানের মাঠ কয়েক দিনের ব্যবধানে পরিণত হয়েছে অথৈ পানির সাগরে। আধাপাকা ধান ডুবে গেছে পানির নিচে। কোথাও পানিতে পচছে কাটা ধান। কোথাও কৃষক বুকসমান পানিতে নেমে শেষ চেষ্টা হিসেবে কাঁচা ধান কাটছেন। আবার কোথাও ফসলহানির শোক সহ্য করতে না পেরে কৃষকের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। হাওরের মানুষের এই কান্না শুধু প্রাকৃতিক কারণে নয়, ভুল উন্নয়ন পরিকল্পনারও ফল। হাওরের ফসলহানি শুধু হাওরাঞ্চলের দুর্ভাগ্যের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষিনীতি, পানি ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন পরিকল্পনার দুর্বলতাকেই সামনে এনেছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৫০ হাজার ৭৩ হেক্টর জমির বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবার। বেসরকারি হিসাব বলছে, ক্ষতির পরিমাণ ৮০ হাজার হেক্টরেরও বেশি। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ এক হাজার ১১০ কোটি টাকার বেশি। এতে প্রায় আড়াই লাখ কৃষক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু একটি মৌসুমের ক্ষতি হিসেবেই বিষয়টিকে দেখলে ভুল হবে। কারণ দেশের মোট চাল উৎপাদনের ৬০ শতাংশের বেশি আসে বোরো মৌসুম থেকে এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি হাওর জেলা একাই দেয় প্রায় ২০ শতাংশ বোরোর জোগান। ফলে হাওরের ফসলহানি দেশের বাজারে বড় প্রভাব ফেলে।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে, কেন প্রতি বছর একই ধরনের বিপর্যয় ঘটছে? কেন হাওরের ফসল রক্ষার নামে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও কৃষকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না? কেন উন্নয়ন প্রকল্পের সংখ্যা বাড়লেও জলাবদ্ধতা, ফসলহানি ও কৃষকের অনিশ্চয়তা কমছে না?
হাওর মূলত একটি জীবন্ত জলাভূমি ব্যবস্থা। প্রাকৃতিক নিয়মে হাওরে বর্ষায় পানি আসে এবং শুষ্ক মৌসুমে ধীরে ধীরে পানি সরে যায়। কিন্তু গত কয়েক দশকে অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, নদী দখল, খাল-বিল ভরাট, অকার্যকর স্লুইসগেট এবং পলি জমে প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় হাওরের স্বাভাবিক চরিত্র বদলে গেছে। ফলে সামান্য অতিবৃষ্টি কিংবা উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলেও পানি আটকে থেকে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।
হাওরে আগাম বন্যা ছিল ফসলহানির সবচেয়ে বড় দুর্যোগের নাম। কিন্তু এবার দুর্যোগের ধরন পাল্টে জলাবদ্ধতার রূপে দেখা দিয়েছে। এপ্রিলের শেষদিকে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করে। কিন্তু পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক ব্যবস্থা না থাকায় বহু এলাকায় পানি আটকে যায়। কোথাও ফসলরক্ষা বাঁধ দুর্বল হয়ে ভেঙে পড়ে, কোথাও আবার পানি বের হওয়ার পথ বন্ধ থাকায় ধানজমির পর ধানজমি পানির নিচে ডুবে যায়। অর্থাৎ বিপদ শুধু বন্যা নয়; এর চেয়ে বড় সংকট হলো দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা।
- ট্যাগ:
- মতামত
- হাওরাঞ্চল
- ফসলের ক্ষতি