কৃষক কেন এখনো মহাজননির্ভর
দেশের ব্যাপক মানুষের এমনটিই ধারণা যে ফসল ওঠার মৌসুম মানেই কৃষকের জন্য আনন্দের মৌসুম। আসলে এটি নিছকই দৃশ্যমানতা, যে দৃশ্যমানতার আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য এক কঠিন, করুণ, নির্মম বাস্তবতা। এ দেশে অধিকাংশ কৃষকের জীবনে এখনো ফসল ওঠার মৌসুম মানেই নিজের খেতের ধান মাঠ বা উঠান থেকে সরাসরি মহাজন বা আড়তদারের গোলায় তুলে দেওয়া। কোনো কোনো কৃষক মাড়াইয়ের উদ্দেশ্যে সে ধান সাময়িক সময়ের জন্য নিজের উঠানে ওঠালেও পুরোটা নিজের গোলায় তুলতে পারেন না কখনোই। এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ উঠান থেকেই সরাসরি চলে যায় আগে থেকে নেওয়া ঋণের বিপরীতে মহাজনের আড়তে কিংবা দাদনদারের হেফাজতে। তবে সে যাওয়ায়ও আপত্তি থাকত না, যদি না তা বিনিময়-প্রথা বা বেচাকেনার ন্যূনতম যুক্তি মেনে ঘটত। কিন্তু বাস্তবে সে ধরনের যুক্তি ও ন্যায্যতার বিন্দুমাত্র ছিটেফোঁটাও এ ক্ষেত্রে নেই। বরং যা আছে তার সঙ্গে সামন্তযুগীয় শোষণ, বঞ্চনা ও নিগ্রহেরই কেবল মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
দেশের ছোট কৃষকেরা সব মিলিয়ে যা উৎপাদন করেন, তা দিয়ে সারা বছরের না হোক অন্তত ৯-১০ মাসের অন্নের সংস্থান হয়ে যেতে পারত। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, অন্নাভাবে থাকা ওই কৃষককে শেষ দু-তিন মাসের খাবার জোগাড় করতে গিয়ে প্রায়ই শরণাপন্ন হতে হয় জোতদার-মহাজন, ধান-চালের আড়তদার কারবারি কিংবা কোনো এনজিওর কাছে। মহাজন তখন ওই খাদ্য ঘাটতিতে থাকা কৃষককে ঋণ দিয়ে সাহায্য করেন বটে। কিন্তু সে ঋণ এতটাই উচ্চ সুদযুক্ত হয় যে ফসল তোলার পর নতুন ধান বা ফসলের একটি বড় অংশই চলে যায় মহাজনের পাওনা শোধ করতে গিয়ে। অন্যদিকে কৃষককে ঋণ দেন আড়তদারও। কিন্তু সেখানেও শর্ত থাকে, ফসল ওঠার পর ওই ধান বাধ্যতামূলক বিক্রি করতে হবে ঋণদাতা আড়তদারের কাছে—আড়তদারেরই ঠিক করা মূল্যে, যা বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম। অথচ এ ফসল এভাবে মহাজন বা আড়তদারের গোলায় বা গুদামে তুলে দিতে না হলে তাঁর সারা বছরের খাবারের সংস্থানও হয়তো নিজের উৎপাদিত ফসল থেকেই হয়ে যেত।
খাদ্য ঘাটতিতে পড়া ওই অভাবী কৃষককে ঋণ দেওয়ার জন্য মহাজন বা আড়তদারের পাশাপাশি স্বাধীনতার পর থেকে যুক্ত হয়েছে গ্রামীণ ব্যাংকের মতো এনজিওগুলোও। এদের ঋণের শর্তও সেই একই রকম উচ্চ সুদ ও অন্যান্য নানা কঠিন শর্তের বেড়াজালে। এরাও ফসল উঠতে না উঠতেই ঋণগ্রহীতা কৃষককে ঋণ পরিশোধের জন্য চারদিক থেকে জাপটে ধরে। অসহায় কৃষক তখন এনজিওর ঋণ পরিশোধের জন্য নিরুপায় হয়ে ওই নতুন ধান ঘরে তোলার আগেই আরেক দফা নিম্নমূল্যে বা অপমূল্যে মহাজন বা আড়তদারের কাছে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। অথচ এনজিওগুলো যদি ওই কৃষককে ঋণ পরিশোধের জন্য খানিকটা সময় দিত, তাহলে কৃষক হয়তো একই ধান বা ফসল কিছুদিন পরে বিক্রি করতে পারলে আরও অনেক ভালো মূল্য পেতেন এবং সেই একই ধান দিয়ে ঋণের একটি বড় অংশ বা পুরোটাই তিনি শর্তানুযায়ী পরিশোধও করে দিতে পারতেন।
মোটকথা, মহাজন, আড়তদার, এনজিও ও আপন সংস্কৃতির অনুশাসন—এ চতুর্বিধ পীড়নের চক্রে পড়ে ক্ষুদ্র কৃষকের অবস্থা এখন ভূমিহীন কৃষকের পরেই সবচেয়ে করুণ। আর এ নিষ্ঠুর-করুণ অবস্থার মধ্য দিয়েই বছরের পর বছর ধরে চলছে তাঁর নিরন্তর দিনাতিপাত। সরকার আসে, সরকার যায়। আর বারে বারে আসা অভিন্ন চরিত্রের এই সরকারগুলো কৃষকের স্বার্থের নাম করে দলীয় ও গোষ্ঠীগত নানা নামে নানা কর্মসূচি নেয় বটে। কিন্তু সেগুলোর প্রায় সবই লোপাট হয়ে যায় দলীয় ও দলের পরিচয় দিয়ে বারে বারে গজিয়ে ওঠা টাউট-বাটপারশ্রেণির গুপ্ত সদস্যদের দ্বারা। ফলে কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নের নামে নেওয়া ওই সব কর্মসূচি উল্লিখিত চতুর্চক্রের হাত থেকে ক্ষুদ্র কৃষককে কিছুতেই রক্ষা বা উদ্ধার করতে পারছে না। একেবারে হালে নেওয়া নতুন কর্মসূচি তা পারবে, তেমনটিও মনে হচ্ছে না। কারণ, এসবের নিয়ন্ত্রণ একটি যৌক্তিক ব্যবস্থার হাতে নেই, আছে দলীয় নেতা-কর্মীদের হাতে অথবা দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মচারীদের অদৃশ্য কারসাজির মধ্যে। ফলে সম্পদস্বল্পতার এ রাষ্ট্রে কৃষকের কল্যাণের নামে ব্যয়িত অর্থ বস্তুত গোষ্ঠীবিশেষের সম্পদের স্ফীতিকেই হয়তো শুধু বাড়াবে, কৃষকের কল্যাণকে নয় কিছুতেই।
এমনই পরিস্থিতিতে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকের নিত্যদিনের কঠিন সংগ্রামের পাশে দাঁড়ানো ও তাঁর অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে এখানে কয়েকটি প্রস্তাব তুলে ধরা হলো।
এক. গত পাঁচ বছরের মধ্যে যেসব কৃষক কোনো মহাজন, আড়তদার বা এনজিওর কাছ থেকে ঋণ নিয়ে খাদ্য ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করেছেন, তাঁদের তালিকা তৈরি করে তাঁদের জন্য বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি) ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) মাধ্যমে স্বল্প কিস্তিতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এ তালিকা প্রণয়নের কাজটি শতভাগ গত পাঁচ বছরের প্রামাণ্য তথ্যের ভিত্তিতে হতে হবে এবং সেখানে দলীয় বা অন্য কোনো তদবির বা সুপারিশ বিবেচনায় নেওয়া যাবে না। এ কাজে ইউনিয়ন পরিষদ বিকেবি বা রাকাবকে সহযোগিতা করতে পারবে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। আর কাজটি স্বচ্ছ ও প্রামাণ্য তথ্যের ভিত্তিতে হচ্ছে কি না, উপজেলা পরিষদ তা নিয়মিতভাবে তদারকি ও পর্যবেক্ষণ করবে। তবে এ তহবিল যেহেতু বিকেবি বা রাকাবের, সেহেতু এ ব্যাপারে তাদের সিদ্ধান্তকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং উপজেলা পরিষদের ভূমিকা কোনো অবস্থাতেই যেন তাদের ওপর খবরদারির পর্যায়ে চলে না যায়।
দুই. বিভিন্ন মহাজন, আড়তদার ও এনজিওর কাছে যেসব কৃষকের বকেয়া ঋণ রয়েছে, সেসব কৃষকের একটি তালিকা তৈরি করে ওই ঋণের আংশিক বা পূর্ণ সুদ মওকুফের বিষয়ে একটি উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে উল্লিখিত সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে এমন একটি ফয়সালায় উপনীত হওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে, যেখানে ঋণদাতা কোনো পক্ষকেই ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না করেও কৃষককে কিছুটা উপশম দেওয়া যায়। এ বিষয়ে ১৯৩৬ সালের কৃষি ঋণদাতা আইনের বিষয়টি বিশেষভাবে স্মরণ করা যেতে পারে, যার আওতায় সারা বাংলায় ১১ হাজার ঋণ সালিসি বোর্ড গঠন করে অসহায় কৃষকদের জমিদার ও মহাজনের হাত থেকে মুক্ত করা হয়েছিল।
তিন. বিকেবি ও রাকাবসহ অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের আওতায় অন্তত পাঁচ বছর ধরে যেসব কৃষিঋণ বকেয়া আছে, সেসব ঋণের মধ্যে ৫০ হাজার টাকার নিম্নবর্তী মূল ঋণের সুদ অংশের ৫০ শতাংশ মওকুফ করে দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নানা ঠুনকো ও কৃত্রিম কারণ বা অসিলা তৈরি করে প্রতিবছরই বড় ঋণগ্রহীতাদের কোটি কোটি টাকা মওকুফ করে দিচ্ছে, যার সঙ্গে রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু কৃষিঋণের এ সামান্য সুদ মাফ করে দেওয়া হলে বিপুলসংখ্যক কৃষকই শুধু উপকৃত হবে না, কৃষি খাতে সামগ্রিক উৎপাদন বৃদ্ধিতেও তা ব্যাপকভাবে সহায়ক হবে বলে আশা করা যায়।
- ট্যাগ:
- মতামত
- কৃষি উৎপাদন