শেখার সংকট : সমাধানের উপায়
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ এক নীরব কিন্তু গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ সংকটের দুটি মুখের একটি হলো শিক্ষকের সংকট, আরেকটি শেখার সংকট। বাহ্যিকভাবে বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, ভর্তির হার বেড়েছে, অবকাঠামো উন্নত হয়েছে, এমনকি ডিজিটাল শিক্ষার কথাও বলা হচ্ছে। কিন্তু অন্তর্গত বাস্তবতা বলছে ভিন্নকথা-শিক্ষার্থীরা স্কুলে যাচ্ছে, ক্লাস করছে, পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে, সনদ পাচ্ছে; কিন্তু তাদের শেখার গভীরতা, দক্ষতা ও বাস্তব জীবনে প্রয়োগযোগ্য জ্ঞান কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছাচ্ছে না। এ দুই সংকট আলাদা নয়, বরং একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। শিক্ষক সংকট সরাসরি শেখার সংকট তৈরি করছে, আর শেখার সংকট আবার শিক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ফলে এটি এখন কেবল শিক্ষা খাতের সমস্যা নয়; বরং জাতীয় উন্নয়ন, মানবসম্পদ গঠন এবং ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশে শিক্ষক সংকটকে সাধারণত সংখ্যাগত ঘাটতি হিসাবে দেখা হয়। কিন্তু বাস্তব সংকট আরও গভীর। এটি শুধু শিক্ষক না থাকা নয়; বরং দক্ষ, প্রশিক্ষিত, অনুপ্রাণিত এবং ভবিষ্যৎ উপযোগী শিক্ষকের অভাব। গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক বিদ্যালয়ে এখনো বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক ঘাটতি প্রকট। বিশেষ করে গণিত, বিজ্ঞান ও ইংরেজি বিষয়ে দক্ষ শিক্ষক পাওয়া কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে একজন শিক্ষককে একাধিক বিষয় পড়াতে হয়, যা শিক্ষার গুণগত মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো শিক্ষক প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতা। দেশে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান থাকলেও প্রশিক্ষণের সঙ্গে বাস্তব শ্রেণিকক্ষের সংযোগ দুর্বল। প্রশিক্ষণে আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতি, সক্রিয় শিক্ষণ পদ্ধতি, প্রযুক্তি ব্যবহার বা মূল্যায়ন কৌশল শেখানো হলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ সীমিত। এর ফলে প্রশিক্ষণ ও শ্রেণিকক্ষ বাস্তবতার মধ্যে বড় ফাঁক তৈরি হয়।
তৃতীয়ত, শিক্ষক পেশার সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক প্রণোদনার ঘাটতি রয়েছে। অনেক মেধাবী তরুণ শিক্ষকতা পেশাকে প্রথম পছন্দ হিসাবে গ্রহণ করছেন না। ফলে শিক্ষা খাতে মেধার প্রবাহ কমে যাচ্ছে। আবার অনেক শিক্ষক পেশাগত হতাশা ও প্রশাসনিক চাপের কারণে উদ্ভাবনী শিক্ষণ থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন।
চতুর্থত, শিক্ষকরা অনেক সময় অতিরিক্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব, রিপোর্টিং, প্রকল্প কাজ ও বহিরাগত চাপের মধ্যে থাকেন। ফলে তারা শ্রেণিকক্ষের মূল কাজে, অর্থাৎ শিক্ষার্থীর শেখা উন্নয়নে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না।
এসব মিলিয়ে শিক্ষক সংকট এখন শুধু সংখ্যা নয়; এটি একটি গুণগত সংকট। বিশ্বব্যাপী শিক্ষাব্যবস্থায় এখন একটি নতুন শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে শেখার সংকট। এর অর্থ হলো, শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকলেও তারা কার্যকরভাবে শিখতে পারছে না। বাংলাদেশেও এ চিত্র স্পষ্ট। বহু শিক্ষার্থী প্রাথমিক স্তর শেষ করেও সঠিকভাবে পড়তে বা গণিতের মৌলিক ধারণা প্রয়োগ করতে পারে না। মাধ্যমিক স্তরে পৌঁছেও তাদের বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং বাস্তব জীবনে জ্ঞান প্রয়োগের ক্ষমতা দুর্বল থাকে। এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, মুখস্থনির্ভর শিক্ষা। এখনো অনেক শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের শেখানো হয় তথ্য মুখস্থ করতে, চিন্তা করতে নয়। ফলে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেলেও বাস্তব জীবনে জ্ঞান ব্যবহার করতে পারে না। দ্বিতীয়ত, শ্রেণিকক্ষের বড় আকার। অনেক বিদ্যালয়ে ৬০ থেকে ১০০ জন শিক্ষার্থী একসঙ্গে একটি ক্লাসে থাকে। এই অবস্থায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক শেখা, দলীয় কার্যক্রম বা সক্রিয় অংশগ্রহণ সম্ভব হয় না। তৃতীয়ত, মূল্যায়ন পদ্ধতির দুর্বলতা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরীক্ষানির্ভর মূল্যায়ন শিক্ষার্থীদের কেবল পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করে, শেখার জন্য নয়। চতুর্থত, শিক্ষণ পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা। অনেক শিক্ষক এখনো লেকচারভিত্তিক পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। সক্রিয় শিক্ষণ, অনুসন্ধানভিত্তিক শিক্ষা বা প্রকল্পভিত্তিক শেখা সীমিতভাবে ব্যবহৃত হয়। এ দুই সংকট আলাদা নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক। দক্ষ শিক্ষক ছাড়া মানসম্মত শেখা সম্ভব নয়, আবার শেখার দুর্বলতা শিক্ষক ব্যবস্থাকেও দুর্বল করে তোলে। একজন প্রশিক্ষিত, অনুপ্রাণিত ও দক্ষ শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের সক্রিয় করে তুলতে পারেন। তিনি শুধু পাঠদান করেন না; বরং শিক্ষার্থীদের চিন্তা করতে শেখান, প্রশ্ন করতে শেখান এবং বাস্তব জীবনের সঙ্গে জ্ঞান যুক্ত করতে সাহায্য করেন। অন্যদিকে, যখন শিক্ষক প্রশিক্ষণ দুর্বল হয় বা শিক্ষক অতিরিক্ত চাপের মধ্যে থাকেন, তখন শেখার প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষার মান নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো শিক্ষক। একজন দক্ষ শিক্ষক শিক্ষার্থীর শেখার ফলাফল উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করতে পারেন। কিন্তু অদক্ষ বা অনুৎসাহী শিক্ষক শেখার সংকটকে আরও গভীর করে তোলেন।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা