একজন জননেতার বিদায়: তোফায়েল আহমেদকে স্মরণ

জাগো নিউজ ২৪ চিররঞ্জন সরকার প্রকাশিত: ০২ জুন ২০২৬, ১২:১১

তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুর খবর শুনে খুব একটা অবাক হইনি। অবাক হওয়ার কথাও না। গত কয়েক বছর ধরেই তিনি কার্যত জনজীবনের বাইরে ছিলেন। অসুস্থতা তাঁকে এমনভাবে গ্রাস করেছিল যে, আমরা অনেকেই আসলে ধীরে ধীরে তাঁর বিদায়ের জন্য প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু মানুষ চলে গেলে প্রস্তুতি বলে কিছু থাকে না। খবরটা শুনে তারপরও একটা শূন্যতা তৈরি হয়। আমার অন্তত হয়েছে। মনে হয়েছে, বাংলাদেশের রাজনীতির একটা পুরোনো দরজা আরও একটু বন্ধ হয়ে গেল। একটা প্রজন্মের আরেকটি পরিচিত মুখ ইতিহাসের পাতায় চলে গেল।


তোফায়েল আহমেদকে নিয়ে লিখতে বসলে অনেকেই তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে শুরু করবেন। সেটাই স্বাভাবিক। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ছাত্রলীগ, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য— এসব পরিচয়ের তালিকা ছোট নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর সঙ্গে তাঁর নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।


কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আমি যখন তাঁর কথা ভাবি, তখন এসব কিছু মনে পড়ে না। আমার মনে পড়ে মানুষটাকে। এই কথাটা আজকাল অনেকেই বলেন। কিন্তু সব মানুষের ক্ষেত্রে তা সত্যি নয়। অনেক রাজনীতিবিদ আছেন, যাদের ক্ষেত্রে পদটাই আসল, মানুষটা নয়। ক্ষমতা চলে গেলে তাদের সম্পর্কে মানুষের স্মৃতিও দ্রুত ফিকে হয়ে যায়। তোফায়েল আহমেদের ক্ষেত্রে আমার অভিজ্ঞতা উল্টো।


তাঁর সঙ্গে আমার খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল না। কয়েকবার দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। আমার অগ্রজ সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকারের সূত্রে। বিভুদাকে তিনি খুব স্নেহ করতেন। সেই সুবাদে আমিও তাঁর কাছ থেকে এক ধরনের আন্তরিকতা পেয়েছি। আর সেই আন্তরিকতাটা অভিনয় ছিল না।


আজকাল রাজনীতিবিদদের মধ্যে যে ধরনের সৌজন্য দেখা যায়, তার অনেকটাই ক্যামেরার জন্য। সামনে হাসিমুখ, পেছনে দূরত্ব। সামনে কুশল বিনিময়, পেছনে অনাগ্রহ। তোফায়েল আহমেদের মধ্যে আমি অন্তত সেটা দেখিনি।


একটা বিষয় আমাকে সবসময় মুগ্ধ করত। তিনি মানুষকে মনে রাখতেন। আমরা এখন এমন এক সময়ে বাস করি, যেখানে মানুষ মানুষের নামই মনে রাখে না। মোবাইলে নম্বর সেভ করা আছে, কাজ শেষ, দায়িত্ব শেষ। সম্পর্কও যেন ক্রমশ ডিজিটাল হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তোফায়েল আহমেদের স্মৃতিশক্তি ছিল অন্য রকম। কত মানুষের নাম যে তাঁর মনে থাকত!


শুধু বড় নেতা বা পরিচিত মুখ না। একেবারে সাধারণ কর্মীদেরও। দীর্ঘদিন আগে দেখা হওয়া কোনো ব্যক্তির নামও তিনি মনে রাখতে পারতেন বলে অনেকের মুখে শুনেছি। আর টেলিফোন নম্বর? এখনকার প্রজন্ম হয়তো বিশ্বাসই করবে না। কত নম্বর যে তাঁর মুখস্থ ছিল! শুনেছি, নিজের একটা কৌশল ছিল। সংখ্যা ভেঙে ভেঙে মনে রাখতেন। ‘বাইশ, চল্লিশ, সত্তর’— এভাবে। প্রথমবার শুনে আমারই অবাক লেগেছিল।


আসলে এখন বুঝি, তাঁর স্মৃতিশক্তি শুধু একটি ব্যক্তিগত গুণ ছিল না। এটা ছিল তাঁর রাজনীতির অংশ। কারণ তিনি মানুষকে গুরুত্ব দিতেন। তাই মানুষকে মনে রাখতেন। মানুষের নাম, পরিচয়, গল্প— এসব তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।


আমার সঙ্গে দেখা হলে কথা বলতেন, বিভুদার খোঁজখবর নিতেন। বের হওয়ার সময় গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিতেন। শুনতে খুব সাধারণ লাগে। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা জিনিস বুঝতে শিখেছি— মানুষের চরিত্র বড় বড় ঘটনায় না, ছোট ছোট আচরণে ধরা পড়ে।


একবার ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান নিয়ে একটি লেখা আনতে গিয়েছিলাম। প্রায় আধঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছিল। আমার কাছে বিষয়টা একেবারেই স্বাভাবিক ছিল। একজন জাতীয় নেতার কাছে গেছি, কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই পারি। কিন্তু দেখা হওয়ার পর তিনি কয়েকবার বললেন, ‘তোমাকে অনেকক্ষণ বসিয়ে রাখলাম।’ আমি একটু অবাকই হয়েছিলাম। যে মানুষের সঙ্গে দেখা করার জন্য অনেকে দিনের পর দিন ঘুরেছেন, তিনি কিনা আধঘণ্টা অপেক্ষা করানোর জন্য অস্বস্তি বোধ করছেন! ঘটনাটা খুব ছোট। কিন্তু আজ এত বছর পরও আমি ঘটনাটা মনে রেখেছি।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

এই সম্পর্কিত

আরও