হিংসাদীর্ণ পশ্চিমবঙ্গ ও রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ
প্রতিবছর রবীন্দ্রনাথ আসেন বঙ্গের চিত্তপ্রাঙ্গণে-শুধু স্মৃতির মানুষরূপে নন, বিবেকের আগ্নেয় পরশ হয়ে। যখন শিরীষের ফুল ফোটে, পলাশের রক্তিম আভা বনের বুক চিরে ওঠে, বৈশাখের দুপুরে মাটির গন্ধমাখা কালবোশেখি হাওয়া বইতে শুরু করে, তখন বাংলার ঘরে ঘরে জেগে ওঠে সেই কণ্ঠ-‘একি সুধা, একি ছায়া গগনে গগনে।’
কিন্তু এ জাগরণ কি শুধুই উৎসবের বাঁশি? নাকি এটি সেই আগুনের স্ফুলিঙ্গ, যা ফের স্মরণ করিয়ে দেয়, রবীন্দ্রনাথ শুধু গীতবিতানের কবি নন, তিনি সভ্যতার সংকটের দার্শনিক, বিভাজনের তীব্র সমালোচক ও মানবমৈত্রীর অকুণ্ঠ পথিকৃৎ?
২০২৬ সালের এই ২৫ বৈশাখ-যেদিন রবীন্দ্রনাথের জন্মের ১৬৫তম বসন্ত অতিক্রান্ত-পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মঞ্চে দৃশ্যমান এক অভিনব পরিস্থিতি। গণতন্ত্রের ইতিহাসে সন্দিগ্ধ সেই নির্বাচনের উত্তাপ এখনো জ্বলন্ত। ভোটারের নাম তালিকা থেকে হারিয়ে যাওয়া, প্রশাসনিক হাতের অস্বাভাবিক চাপ, সংখ্যালঘু জনপদে আতঙ্কের স্রোত, ধর্মীয় হিংসার উন্মত্ততা, বিক্ষোভ দমনে পুলিশি নিস্পৃহতা-এসবের গ্লানি বুকে নিয়ে ক্ষমতায় বসতে চলেছে সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ববাদী বিজেপির নবগঠিত সরকার। আর সেই সরকারের শপথগ্রহণের তারিখটিকে বেছে নেওয়া হয়েছে রবীন্দ্রজয়ন্তীর পুণ্যতিথিতে।
কালবৈশাখীর এমন দিনে-যেদিন রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ‘ওরে ভাই, মাটির ডাক এসেছে রে, আঁধার রাতের শেষে’-সেদিন প্রশ্ন দাঁড়ায় নিঃশব্দে ও নির্মমভাবে : পশ্চিবঙ্গের বিভাজিত ও রক্তস্নাত রাজনৈতিক বাস্তবতায় রবীন্দ্রনাথের প্রদীপ কি সাক্ষী থাকবে আনন্দের? নাকি থাকবে প্রশ্নের, রক্তের, সাম্প্রদায়িক হিংসার? রবীন্দ্রচেতনায় প্রজ্বলিত মানবতাবাদের দার্শনিক ভিত্তি অটুট থাকবে অমানবিক নৃশংসতার পরিসরে?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বোঝার জন্য তাকে শুধু কবির আসনে বসিয়ে রাখলে ভুল হয়। তিনি ছিলেন এক সমগ্র মানবতাবাদী বিশ্বদৃষ্টির স্থপতি। তার চিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে বিভাজনবিরোধী এক সর্বজনীন মানবতাবাদ, যা জাতি, ধর্ম, শ্রেণি বা পরিচয়ের সংকীর্ণ সীমাকে অতিক্রম করে মানুষকে বৃহত্তর বিশ্বচৈতন্যের অংশ হিসাবে দেখার আহ্বান জানায়। তার দর্শনের মূলে রয়েছে কয়েকটি স্তম্ভ : প্রথমত, ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’-যে সমাজে মানুষ ভয়ে থাকে, সে সমাজ রবীন্দ্রচেতনার পরিধির বাইরে। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব মানুষকে ভয়মুক্ত করা, ভয় দেখানো নয়। দ্বিতীয়ত, ‘উচ্চ যেথা শির’-আত্মমর্যাদাবোধ ও স্বাধীন চিন্তার অধিকার। যে রাষ্ট্র মানুষের মাথা নিচু করতে বাধ্য করে, সে রাষ্ট্র রবীন্দ্রনাথের কল্পনার বিপরীতে দাঁড়ায়। তৃতীয়ত, ‘জ্ঞান যেথা মুক্ত’-অন্ধবিশ্বাস ও গোঁড়ামিমুক্ত যুক্তিবাদী চর্চার জায়গা। যে রাজনীতি কুসংস্কার ও ভ্রান্ত তথ্যের ওপর ভর করে, তা রবীন্দ্রচেতনার শত্রু। চতুর্থত ও সর্বশেষ, ‘যেখানে বিশ্ব ভাঙে সীমা’-সর্বোপরি তিনি চেয়েছেন বিভাজনের সব দেওয়াল ভেঙে মানবমিলনের এক অখণ্ড ভুবন। ‘বিশ্বভারতী’ তার মূর্তপ্রতীক।
- ট্যাগ:
- মতামত
- রবীন্দ্রজয়ন্তী