‘মা’কে খুব মনে পড়ে
‘মা’-একটি অক্ষর। অথচ এই একটি অক্ষর ধারণ করে আছে পৃথিবীর সব সিনেমা, সব গান, সব কবিতার চেয়েও বড় এক বেদনা ও এক ভালোবাসা। মাকে নিয়ে গল্প-উপন্যাস লিখে কেউ মায়ের প্রকৃত ভালোবাসার দৃষ্টান্ত যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছে বলে মনে হয় না। পারবেও না। মায়ের উদাহরণ মা নিজেই; মায়ের কোনো বিকল্প নেই।
ভাষাবিদদের মতে, পৃথিবীর প্রায় সব ভাষায় ‘মা’ ধ্বনিটি শিশুর প্রথম উচ্চারিত শব্দ। যেন স্রষ্টা নিজেই মানুষের ঠোঁটে ‘মা’ নামটি লিখে দিয়েছেন অনন্তকালের জন্য। আমাদের প্রিয় মাকে সম্মান জানানোর জন্যই একটি বিশেষ দিন হলো ‘মা দিবস’। মে মাসের দ্বিতীয় রোববার বিশ্ব মা দিবস। যদিও মাকে ভালোবাসার জন্য আলাদা দিনের প্রয়োজন নেই, তবু বিশেষ মানুষটির জন্য একটি বিশেষ দিন মন্দ নয়। দিবসটির আধুনিক ইতিহাস শুরু হয় ১৯০৮ সালে, মার্কিন সমাজকর্মী আনা মেরি জারভিসের হাত ধরে। যুদ্ধবিধ্বস্ত যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের স্বাস্থ্য রক্ষায় কাজ করতেন তার মা আনা রিভিজ জারভিস। ১৯০৫ সালে মায়ের মৃত্যুর পর সব মায়ের প্রতি সম্মান জানাতে আনা আন্দোলনের ডাক দেন। ১৯১৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন এ দিনটিকে ‘জাতীয় মা দিবস’ হিসাবে স্বীকৃতি দেন। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশে এ দিবসটি পালিত হয়।
উদযাপন যে দিনেই হোক, দিবসটি বিশ্বজুড়ে মাতৃত্ব ও মাতৃসত্তার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। স্মরণ করিয়ে দেয় পৃথিবীতে আমাদের পদচারণার মূল কান্ডারিকে। মা দিবসের ইতিহাস যত বড়, তার চেয়ে বড় আমার নিজের মায়ের ইতিহাস। আজ বিশ্ব মা দিবস উপলক্ষ্যে আমিও স্মৃতিরোমন্থনে আবেগে আপ্লুত। যতবার মাকে নিয়ে লিখতে বসেছি, দুচোখ দিয়ে শুধু কান্না আসছে। কারণ, মাকে ‘মা’ বলে ডাকতে পারছি না-এগারো বছর হয়ে গেল।
আমি দুই সন্তানের বাবা। বাবা হয়ে বুঝেছি, একজন মা কত কষ্ট সহ্য করেন। আমার স্ত্রী প্রথম সন্তানের সময় ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন। দ্বিতীয় সন্তানের পর একলামসিয়া, তারপর পাইলসের অপারেশন। গর্ভকালীন বমি, অরুচি, মেজাজের তারতম্য-এসব মা ছাড়া কেউ বোঝে না। আমার স্ত্রীর অসুস্থতার দিনগুলোয় আমি যখন অসহায়বোধ করেছি, তখন বারবার ফিরে গেছি আমার মায়ের সেই নীরব কষ্টের দিনগুলোর দিকে।
আমার মা ছিলেন গৃহিণী। বাবা চাকরির সূত্রে দূরে থাকতেন, তাই চার ভাইবোনের সংসার সামলানো, রান্না করা, পড়াশোনা করানো-সবটাই ছিল মায়ের একার কাঁধে। মায়ের হাতের সেই গরুর মাংস আর ভাপা পিঠার স্বাদ আজও জিভে লেগে আছে। ‘কই বাবা, তোরা খেতে আয়’-এই ডাক আজ শুধু স্মৃতির ভিড়ে শুনি। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ‘মা মা’ বলে ডাকলে তিনি বলতেন, ‘আমার পাগলা ছেলেটা এসেছে।’ আজ সেই ডাক শুনি না। ‘বাবা, খেয়েছ? কোথায় আছ? সাবধানে থেক?’-এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কেউ নেই।
আজ মা দিবসের আড়ালে যখন দেখি কোনো মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে, কিংবা মাকে নানাভাবে কষ্ট দিচ্ছে, তখন বুক ফেটে হাহাকার আসে। যিনি হাত ধরে হাঁটতে শিখিয়েছেন, তাকে শেষ বয়সে পর করে দেওয়ার চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর নেই।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বিশ্ব মা দিবস