শিক্ষায় অশনিসংকেত
শুনতে যেমনই শোনা যাক, বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে গত এক-দেড় দশকে উপজেলা পর্যায়ে সরকারি হওয়া কলেজগুলোতে চলমান শিক্ষা কার্যক্রমটি একদম ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বিশেষ কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা এলাকা নয়, বলতে গেলে সারা দেশেরই এ এক অভিন্ন চিত্র। কলেজে কলেজে শিক্ষক সংকট খুবই ভয়াবহ। ৮-১০ বছর ধরে বিরাজমান শিক্ষক সংকট শিগগির দূর করলেও সরকারি কলেজগুলোতে শিক্ষায় স্বাভাবিক ছন্দ ফিরিয়ে আনতে বেশ সময় লাগবে। গত সাড়ে পাঁচ দশকের মধ্যে কলেজগুলোতে এমন শিক্ষক সংকট আর কখনো দেখা দিয়েছে বলে জানা যায় না। আমার নিজের জেলার কথাই বলি।
চার দফায় (২০১২, ২০১৬, ২০১৮ ও ২০২১) উপজেলা স্তরে কিশোরগঞ্জে ১৩টি কলেজ সরকারীকরণ হয়। বেশির ভাগ কলেজেই দীর্ঘদিন, এমনকি সরকারি হওয়ার অনেক আগে থেকেই নিয়মিত অধ্যক্ষ ছিল না। প্রায় সব কলেজ অধ্যক্ষ ছাড়া ভারপ্রাপ্ত দিয়ে চলেছে। এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার শেষ নেই। অন্যদিকে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকটও দীর্ঘদিনের। ফলে পরীক্ষার ফলে বছর বছরই বিপর্যয় ঘটে। ২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর ঢালাওভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারীকরণের অন্তঃসারশূন্যের বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে।
এ এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। ২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৬৪.৬২। কিন্তু কিশোরগঞ্জের সম্প্রতি সরকারি হওয়া কলেজের সব কটিরই স্কোর ৫০ বা ৫০-এর নিচে:
অষ্টগ্রাম সরকারি রোটারি কলেজ (পাসের হার ৫০.২০), ভৈরব সরকারি মহিলা কলেজ (৪৯.৩৯), করিমগঞ্জ সরকারি কলেজ (৪৬.৯৫), পাকুন্দিয়া সরকারি কলেজ (৪৫.৯০), মিঠামইন মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হক সরকারি কলেজ (৪৪.১০), ভৈরব হাজী আসমত সরকারি কলেজ (৪৩.২৪), বাজিতপুর সরকারি কলেজ (৪১.১২), কটিয়াদী সরকারি কলেজ (৩৯.১৮), নিকলী মুক্তিযোদ্ধা আদর্শ সরকারি কলেজ (৩৭.৯৬), ইটনা সরকারি কলেজ (৩৪.৯৮), হোসেনপুর সরকারি কলেজ (৩৩.২১), তাড়াইল মুক্তিযোদ্ধা সরকারি কলেজ (৩২.৯২) ও কুলিয়ারচর সরকারি কলেজ (পাসের হার ১৮.৯৬)।
বলতে গেলে একই সঙ্গে সরকারি হওয়া কিশোরগঞ্জের আরও দুটি প্রতিষ্ঠান সরকারি হোসেনপুর মডেল পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও বাজিতপুর রাজ্জাকুন্নেছা সরকারি পাইলট গার্লস হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ। ২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় হোসেনপুর সরকারি হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজে পাসের হার ১৪.২৩ এবং রাজ্জাকুন্নেছা সরকারি গার্লস হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজে ১১.৭১ শতাংশ।
কেস স্টাডি ১: প্রায় ৩ হাজার ছাত্রছাত্রী; ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত, বলা যায় পূর্ণাঙ্গ একটি কলেজ। উচ্চমাধ্যমিকের (মানবিক, বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা) পাশাপাশি ১৯৭০ সাল থেকে ডিগ্রি স্তরে কলা ও বাণিজ্য শাখা এবং ১৯৯০ সালে বিজ্ঞান শাখা (বিএসসি) খোলা হয়। ২০১২ সাল থেকে চারটি বিষয়ে অনার্স চালু রয়েছে। এমন একটি কলেজে অর্থনীতি বিষয়ে ১০ বছরের বেশি সময় ধরে কোনোরকমে পাঠ দিয়ে চলেছেন মাত্র একজন শিক্ষক। সরকারীকরণের অন্তত চার বছর আগে ২০১৪ সালে অন্য একজন শিক্ষক (দ্বিতীয় শিক্ষক) নিয়োগ পেয়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার পর থেকে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। একই পরিস্থিতি দর্শন বিষয়েরও। কর্মরত দুই শিক্ষকের মধ্যে একজন অবসর নেন ২০১৮ সালে। তখন থেকে উচ্চমাধ্যমিক ও ডিগ্রি স্তরে পাঠদান চালিয়ে যেতে হচ্ছে একজন মাত্র শিক্ষককে। গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের মতো বিষয়েরও একই হাল, অন্তত ১০ বছর ধরে উচ্চমাধ্যমিক
ও ডিগ্রি স্তরে পড়ান একজন করে শিক্ষক। গণিত যেমনই হোক; পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক ২০২১ সালে অবসরে গেলে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় একজনকে,
প্রায় পাঁচ বছর ধরে পুরো ডিপার্টমেন্ট তাঁকেই (খণ্ডকালীন শিক্ষক) সামলাতে হচ্ছে (উচ্চমাধ্যমিক ও ডিগ্রি স্তর)। রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজকর্ম ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অনার্স চলমান থাকলেও প্রতিটি বিভাগে নিয়মিত শিক্ষক রয়েছেন একজন করে। একে একে দুজন অবসরে গেলে ইতিহাস বিভাগও চলছে নিয়মিত একজন শিক্ষক দিয়ে।
২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলে দেখা যায়, কলেজ থেকে মোট ৭২৭ জন অংশ নেয় আর পাস করে ২৯৯ জন (পাসের হার ৪১.১২)।
কেস স্টাডি ২: ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত। কলেজটিতে ব্যবস্থাপনা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজকর্ম—মোট তিনটি বিষয়ে অনার্স চালু আছে ২০১২ সাল থেকে। সমাজকর্ম বিষয়ে পদায়ন হওয়া তিনজন শিক্ষকের মধ্যে ইতিমধ্যে দুজন অবসরে গেছেন, একজন মাত্র শিক্ষক দিয়ে চলছে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি, ডিগ্রি পাসসহ অনার্সের ক্লাস। হিসাববিজ্ঞান বিভাগের তিনজন শিক্ষকের মধ্যে নেই একজনও। অর্থনীতি বিষয়ে দুজনের মধ্যে আছেন একজন, তিনিই একমাত্র ভরসা। ইসলামি শিক্ষা বিষয়ের দুজন শিক্ষকের উভয়ে পদায়নের আগেই ২০১৮ সালে অবসর নেন। অতএব দুজনের জায়গায় খণ্ডকালীন একজন শিক্ষক দিয়ে চলছে পাঠদান।
পরীক্ষায় অংশ নেয় মোট ৫৩৯ জন আর পাস করে ১৮১ জন (পাসের হার ৩৩.২১)।
কেস স্টাডি ৩: ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ডিগ্রি স্তরের কলেজ। ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির (আইসিটি) মতো আবশ্যিক বিষয়েও নিয়মিত কোনো শিক্ষক নেই। খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে ইংরেজি বিষয়ে তিনজন ও আইসিটিতে দুজনকে নিয়োগ দিয়ে কাজ চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদভুক্ত বিষয়গুলোতে মাত্র দুজন শিক্ষক রয়েছেন। ডিগ্রি কোর্স চালু হয় ১৯৯৮ সালে। বর্তমানে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দর্শন ও ইতিহাস বিষয়ে একজন করে শিক্ষক রয়েছেন; তাদের ওপরই উচ্চমাধ্যমিক ও ডিগ্রি স্তরে পাঠদানের দায়িত্ব ন্যস্ত।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা