স্থানীয় সরকারব্যবস্থার সংস্কার অনেক রোগের ওষুধ

যুগান্তর মো. ইলিয়াস হোসেন প্রকাশিত: ০৯ মে ২০২৬, ১১:০৭

আমরা বারবার জাতীয় নির্বাচন, কেন্দ্রীয় সরকার, মন্ত্রিসভা কিংবা সংসদীয় কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা করি; কিন্তু গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি যে গ্রাম, ইউনিয়ন ও উপজেলায় নিহিত-সেই সত্যটি বারবার উপেক্ষিত থেকে যায়। বাস্তবতা হলো, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সূচনা প্রায়ই তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু হয়। ফলে রাষ্ট্র সংস্কারের যে কোনো রূপরেখা স্থানীয় সরকারকে কেন্দ্র করেই প্রণীত হওয়া উচিত।


বাংলাদেশের ইতিহাসে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার একটি উল্লেখযোগ্য প্রয়াস ছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ‘গ্রাম সরকার’ উদ্যোগ। তার দর্শনে বিকেন্দ্রীকরণ ছিল প্রশাসনিক দক্ষতা ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রধান উপায়। গ্রামভিত্তিক সংগঠিত প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলে উন্নয়নকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা ছিল সেই সময়ের অন্যতম লক্ষ্য। স্বাধীনতা-পরবর্তী অস্থিরতার মধ্যেও তিনি তৃণমূল প্রশাসনকে সংগঠিত করে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে উপজেলা পদ্ধতি চালু হলেও ধারাবাহিক নীতির অভাব, রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি এবং কেন্দ্রীয়করণের প্রবণতায় সেই কাঠামো শক্ত ভিত পায়নি। ফলে স্থানীয় সরকার আজও কাঙ্ক্ষিত জবাবদিহিমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত কাঠামোয় রূপ নিতে পারেনি।


বাংলাদেশে আমরা দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, প্রভাব বিস্তার, রাজনৈতিক দম্ভ এবং প্রশাসনিক অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কথা বলছি; কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়-এ দুর্নীতির উৎপত্তি কোথায়? বাস্তবতা হলো, এর সূচনা হয় গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায় থেকেই। স্থানীয় নির্বাচনে অর্থ লেনদেন, মাসল পাওয়ারের প্রদর্শন, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ-এসবই পরবর্তীকালে বৃহত্তর রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রভাব ফেলে। অতএব, যদি সত্যিকার অর্থে রাষ্ট্র সংস্কার করতে হয়, তবে শুরুটা করতে হবে তৃণমূল থেকেই।


আজকের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমরা দেখছি-স্থানীয় সরকার অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর হলেও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, আর্থিক নির্ভরতা এবং ক্ষমতার এককেন্দ্রিকতার কারণে তা দুর্বল হয়ে পড়েছে। প্রচলিত নির্বাচনব্যবস্থায় তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত নির্বাচনে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। প্রার্থীরা নির্বাচনি প্রচারণায় যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেন, নির্বাচিত হওয়ার পর সেই ব্যয় পুনরুদ্ধারের এক অঘোষিত মানসিক চাপ কাজ করে। ফলে উন্নয়ন প্রকল্প, বরাদ্দ, টেন্ডার, সামাজিক নিরাপত্তা বণ্টন-সব ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতার পরিবর্তে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর প্রভাব দেখা যায়। একইসঙ্গে একক জনপ্রতিনিধির হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমষ্টিগত পরামর্শের চর্চা দুর্বল হয়। এতে গণতান্ত্রিক চর্চা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়। এ বাস্তবতায় কেবল আইন কঠোর করলেই সমাধান আসবে না। প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার-যেখানে ক্ষমতা হবে বিভাজিত, দায়িত্ব হবে নির্দিষ্ট এবং জবাবদিহি হবে প্রাতিষ্ঠানিক।


সংস্কার কখনো একদিনে সম্পন্ন হয় না। এটি একটি ধারাবাহিক ও বহুস্তরীয় প্রক্রিয়া। তাই স্থানীয় সরকারব্যবস্থার সংস্কারেও প্রয়োজন ধাপে ধাপে অগ্রগতি। এর ব্যাপ্তি ও প্রকারভেদ বিবেচনায় দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সর্বাগ্রে প্রয়োজন স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক করা। কারণ জনগণের রাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ ঘটে ইউনিয়ন, উপজেলা ও পৌর পর্যায়েই। সেক্ষেত্রে গ্রাম থেকে জেলা পর্যন্ত সমন্বিত সরকারব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার পদ্ধতি এবং নির্বাচনব্যবস্থা নিুরূপে সংশোধন করা যেতে পারে :


প্রতিটি গ্রামে কেন্দ্রীয় সরকারের আদলে ‘গ্রাম পরিষদ সরকার’ নামে একটি সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করা যেতে পারে, যার প্রধান হিসাবে একজন ‘গ্রাম সরকারপ্রধান’ (Head Man) থাকবে। এ গ্রাম সরকারপ্রধানের অধীনে ১৬ সদস্যের একটি কমিটি থাকবে (সদস্য সংখ্যা কম-বেশি হতে পারে)। এ কমিটির সব সদস্যকেই স্থানীয় নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হতে হবে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন-১. শিক্ষা সম্পাদক, ২. ক্রীড়া সম্পাদক, ৩. পরিকল্পনা ও উন্নয়ন সম্পাদক, ৪. মহিলা ও শিশুবিষয়ক সম্পাদক, ৫. বন ও পরিবেশ সম্পাদক, ৬. অর্থ ও বাজেট সম্পাদক, ৭. ধর্ম সম্পাদক, ৮. কৃষি সম্পাদক, ৯. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক, ১০. সাংস্কৃতিক সম্পাদক, ১১. যোগাযোগ সম্পাদক, ১২. পানি সম্পাদক, ১৩. আইন ও বিচার সম্পাদক, ১৪. দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, ১৫. নির্বাহী সম্পাদক-১ (প্রথম সদস্য সচিব), ১৬. নির্বাহী সম্পাদক-২ (দ্বিতীয় সদস্য সচিব)।


গ্রাম সরকারের অনুরূপ ইউনিয়ন পরিষদ সরকার, উপজেলা পরিষদ সরকার এবং জেলা পরিষদ সরকার থাকবে। প্রত্যেক সরকারের গঠনতন্ত্রে একই সংখ্যক সদস্য থাকবে। প্রত্যেক সরকারের প্রধান হিসাবে একজন প্রধান থাকবে, যার নেতৃত্বে গঠিত কমিটি কেন্দ্রীয় সরকারের আদলে স্ব স্ব গ্রাম-ইউনিয়ন-উপজেলা-জেলার সার্বিক উন্নয়নে নিজ নিজ বিভাগের বার্ষিক বাজেট প্রণয়নসহ সব বিষয়ে দায়িত্ব পালন করবেন। প্রত্যেক সম্পাদকের নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। এ ধরনের পদ্ধতিতে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক হবে, প্রান্তিক পর্যায়ে সমতার ভিত্তিতে উন্নয়ন হবে; ফলে স্থানীয় পর্যায়ের দুর্নীতি ব্যাপক হারে কমে যাবে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় সরকার নির্বাচনেও তাদের বিশেষ ভোটিং ক্ষমতা থাকবে। যেমন-গ্রাম সরকারের প্রধানের ভোটিং ক্ষমতা ১৫, অন্যান্য সম্পাদকের ক্ষমতা ১০। ‘ইউনিয়ন পরিষদ সরকার’-এর অধীনেও ১৬ জন সম্পাদক থাকবে, যাদের ভোটিং ক্ষমতা ‘ইউনিয়ন সরকার’ প্রধানের ক্ষেত্রে ২০ এবং সম্পাদকদের ক্ষেত্রে ১৫ হতে পারে। একইভাবে উপজেলা সরকার প্রধানের ভোটিং ক্ষমতা ২৫ এবং তার সম্পাদকদের (১৬ জন) ভোটিং ক্ষমতা ২০ করা যেতে পারে, জেলা পরিষদ প্রধানের ভোটিং ক্ষমতা ৩০ এবং সম্পাদকদের (সমসংখ্যক) ২৫ করা যেতে পারে।


সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও