এনসিপির ‘উন্মুক্ত দরজা’ নীতি: নতুন মোড়কে কি পুরোনো রাজনীতিরই পুনরাবৃত্তি?
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রধান নাহিদ ইসলামের সাম্প্রতিক একটি মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে বেশ কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে। ১৯ এপ্রিল বিভিন্ন দলের নেতাদের এনসিপিতে যোগদান অনুষ্ঠানের পর এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, তার দলে যোগ দিতে কারও ‘সাবেক পরিচয় মুখ্য নয়।’
সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে নাহিদ ইসলাম বলেছেন, “ছাত্রদল হোক, ছাত্রশিবির হোক, ছাত্র অধিকার পরিষদ, এমনকি ছাত্রলীগ হোক—কারও সাবেক পরিচয় মুখ্য নয়। তবে গণহত্যায় অংশগ্রহণকারী, গণহত্যাকে সমর্থনকারী, চাঁদাবাজ, দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত, সন্ত্রাসী—এ ধরনের ব্যক্তি কখনই এনসিপিতে আসতে বা থাকতে পারবে না।”
তার এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে যে, পতিত ‘ফ্যাসিস্ট’ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগসহ অন্যান্য অঙ্গসংগঠনের সদস্যদের সকলেই গণহত্যা তথা মারাত্মক অপরাধের সঙ্গে যুক্ত নন। এই কথা সাংবাদিকসহ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই বহুদিন ধরে বলে আসছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আওয়ামী লীগের সঙ্গে ন্যূনতম সংশ্লিষ্টতার কারণে তাদের অনেককেই জেলে পাঠানো হয়েছে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারের অন্তর্বর্তী আমলে। আওয়ামী লীগ এবং গণহত্যাকারী ফ্যাসিস্ট এখন মোটামুটি সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নাহিদ ইসলামের এই বক্তব্যের পর আলোচনা শুরু হয়েছে, এনসিপি কি তাহলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করছে? আঁতাত করছে কি না সেটি সময় বলে দেবে; কারণ রাজনীতিতে চিরস্থায়ী শত্রু-মিত্র বলে কিছু নেই।
তার এই বক্তব্যকে ব্যাখ্যা করে ধরে নেওয়া যায়, রাজনীতির মাঠে আওয়ামী লীগের অবস্থান সম্পর্কে হয়তো একটি ভালো ধারণা পেয়েছে এনসিপি। আগামীতে ক্ষমতায় আসতে অথবা নিদেনপক্ষে বড়সংখ্যক আসনে জিততে তাদের দরকার আওয়ামী লীগের সমর্থন, যা সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির পক্ষে গেছে। তাই শর্তসাপেক্ষে দলটি আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের জন্য দরজা উন্মুক্ত করছে।
কিন্তু এনসিপির কাছে জনগণের প্রত্যাশা ছিল ভিন্ন কিছু। বাংলাদেশের ‘পুরাতন ধারার’ রাজনীতির পরিবর্তে ‘নতুন বন্দোবস্তের’ কথা শুনিয়েছেন জনগণকে তারা। বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীদের দলে জড়ো করে নতুন কিছু করা অসম্ভব না হলেও বেশ কঠিন। কারণ দলছুট নেতারা অধিকাংশই হন নীতিবিবর্জিত। তারা দল বদলান ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করতে। দেশ ও জনগণের মঙ্গল-অমঙ্গল তাদের কাছে মুখ্য নয়; যা অতীতে বহুবার দেখেছি আমরা।
এনসিপি হয়তো বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মতো বিভিন্ন দলের, বিভিন্ন মতের মানুষকে একত্র করে বিএনপিরই আদলে একটি জনপ্রিয়, উদারপন্থী দল প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। তবে সেক্ষেত্রে তাদের দরকার হবে জিয়াউর রহমানের মতো একজন সৎ ও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব।
শেখ হাসিনার সরকারকে নজিরবিহীন আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত রাজনৈতিক দল এনসিপি এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন কিছু দেখাতে পারেনি; চলেছে গতানুগতিকভাবেই। এরই মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করে নিজেদের স্বকীয়তা হারিয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন।
দুই-একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। দেশের রাজনীতিতে একটি বড় সমস্যা হলো—ক্ষমতায় গেলে রাজনৈতিক দলগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের নিজস্বতা হারিয়ে ফেলে। সরকার এবং রাজনৈতিক দলের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। ক্ষমতাসীন দলের নেতারা নিজেদের সরকারি কর্মকর্তা অথবা অন্য কিছু মনে করে বসেন। ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় দপ্তরে অবাধে চলাচল করেন; তাদের কোনো প্রটোকল লাগে না। পুলিশ-প্রশাসন থেকে শুরু করে সবাই তাদের সমীহ করে চলেন। দলের ছাত্র সংগঠনের নেতারা অবাধে চলাচল করেন মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে।
আওয়ামী লীগ আমলে ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরা চাইলেই দেখা করতে পারতেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। বিএনপি আমলে ছাত্রদলের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরা একইভাবে প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন মন্ত্রী ও এমপিদের সঙ্গে দেখা করতে পারেন খুব সহজেই। ঠিক তেমনই অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবং এনসিপি প্রধান নাহিদ ইসলাম পদত্যাগ করার পরও খুব সহজেই প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দেখা করতে পারতেন। শুধু তিনি নন, এনসিপির নেতারা খুব সহজেই চলে যেতে পারতেন সরকারপ্রধানের কাছে। এনসিপি নেতাদের নিয়ে বিদেশ সফরও করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস।
অন্যদিকে বিএনপির মতো দেশের সর্ববৃহৎ দলকে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করতে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হতো। সেই সময় বিএনপির নেতারা এমন অভিযোগ প্রকাশ্যে করেছেন।
এর মাধ্যমে দেশের মানুষের কাছে এই বার্তা গেছে যে, এনসিপি ইউনূস সরকারের মদদে গঠিত একটি দল এবং তারা গতানুগতিক পদ্ধতিতে রাজনীতি করছেন।
আরেকটি উদাহরণ দেওয়া যাক। অতীতে ‘পুরাতন বন্দোবস্তের’ রাজনীতিতে দেখেছি, ক্ষমতাসীন দলের কাউন্সিল অথবা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পুলিশসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ব্যাপক তৎপরতা দেখা যায়। অন্যদিকে কোনো বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রাষ্ট্রীয় কোনো প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ দেখা যায় না; কেবল সেখানে উপস্থিত থাকে গোয়েন্দা সংস্থা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু সদস্য।