দলীয় ভাষ্যে জিম্মি মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস
মার্চ এলেই জাতি অনুভব করে মুক্তিযুদ্ধের অমলিন স্মৃতি। কিন্তু একই সঙ্গে সামনে আসে এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা, তা হলো-এখন পর্যন্ত দলীয় ভাষ্যের শৃঙ্খলে জিম্মি হয়ে রয়েছে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধের মতো জাতীয় ইতিহাস এখনো নিরপেক্ষ ও সর্বজনগ্রাহ্য রূপ পায়নি। দলীয় ব্যাখ্যা ও রাজনৈতিক অবস্থানের প্রভাবে থাকায় তা ঐক্যের বদলে বিতর্ক ও বিভাজনের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে; যা ক্ষতিকর এজন্য যে, এর কুপ্রভাব কেবল ইতিহাসচর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং রাষ্ট্র, রাজনীতি, সমাজ ও জাতীয় চেতনার ওপর গভীর সংঘাতের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
যখন মুক্তিযুদ্ধের মতো জাতীয় ইতিহাস দলীয় ব্যাখ্যার অধীন হয়ে পড়ে, তখন সত্য আংশিক বা বিকৃতভাবে উপস্থাপিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এতে নতুন প্রজন্ম, ক্ষমতা বদলের সঙ্গে সঙ্গে পাঠ্যপুস্তক বা ঐতিহাসিক ভাষ্য বদলের জেরে একটি অসংলগ্ন ও বিভ্রান্তিকর ইতিহাসের মুখোমুখি হয়, যা তাদের জাতীয় পরিচয় গঠনে অস্পষ্টতা সৃষ্টি করে। মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি যদি বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাবাধীন হয়, তবে প্রকৃত অবদানকারীরা বঞ্চিত হতে পারেন এবং দলীয় কারণে অযোগ্য ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তি হওয়া স্বাভাবিক।
একটি জাতির সর্বোচ্চ অর্জন মুক্তিযুদ্ধ-যদি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্তি ও লুটপাটের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে তা জাতীয় ঐক্য ও সুশাসনের ভিত্তি হিসাবে কাজ করতে পারে না। বরং এটি বিভাজনকে আরও প্রগাঢ় করে, দুর্নীতির কারণ হয় এবং সামাজিক সংহতি দুর্বল করে। তাছাড়া, ইতিহাসের ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘমেয়াদে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা সৃষ্টি করে। গবেষণা, আর্কাইভ এবং জ্ঞানচর্চা স্বাধীনভাবে বিকশিত হতে পারে না। ফলে একটি শক্তিশালী ও শুদ্ধতর বৌদ্ধিক ঐতিহ্য গড়ে ওঠে না।
এসব কারণেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও মুক্তিযোদ্ধার পরিচয়কে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা শুধু একাডেমিক প্রয়োজন নয়, জাতীয় স্বার্থেই অপরিহার্য কর্তব্য। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত পাঁচবার মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা পরিবর্তিত হয়েছে। ১৯৭২ সালের ৭ আগস্ট প্রণীত ‘The Bangladesh (Freedom Fighters) Welfare Trust Order, 1972’ ছিল এ সংজ্ঞা নির্ধারণের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ। পরবর্তী সময়ে ১৯৮০ সালে সীমিত সংশোধন, ২০১৮ সালে বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস, ২০২২ সালে আংশিক পরিবর্তন এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালের জুনে আবারও সংজ্ঞা পরিবর্তন-এ ধারাবাহিকতা একটি মৌলিক প্রশ্নকে সামনে আনে : রাষ্ট্র কি এখনো মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় নির্ধারণে স্থায়ী ও সর্বজনস্বীকৃত মানদণ্ডে পৌঁছাতে পারেনি? কেন বা কার স্বার্থে তা পারেনি?
আরও প্রশ্ন উঠতে পারে, ‘মুক্তিযোদ্ধা’ সংজ্ঞার পরিবর্তন প্রয়োজনীয় ছিল, নাকি দলীয় স্বার্থে পুনর্লিখন হয়েছে বারবার? ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে সংজ্ঞা বদলে ফেলা কেবল প্রশাসনিক বিষয় হয়ে থাকেনি; বরং তা ক্ষমতাসীন দলের নিজস্ব ভাষ্যের আলোকে রাজনৈতিক ও আদর্শিক পুনর্গঠনের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সংজ্ঞা পুনর্বিন্যাসের প্রবণতা বাস্তবে ছিল দলীয়করণের নিকৃষ্ট উদাহরণ। অর্ধশতাব্দীর অধিককাল পেরিয়েও ‘মুক্তিযোদ্ধা’ সংজ্ঞার একটি স্থিতিশীল কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে না পারার কারণ হলো দলীয় মানসিকতা। এজন্যই দলীয় ভাষ্যে জিম্মি হয়ে আছে মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস।
একই ভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের নামে যে রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যাখ্যা দীর্ঘদিন ধরে চলমান, তা গভীর উদ্বেগের বিষয়। ইতিহাস, যা একটি জাতির আত্মপরিচয়ের ঐক্যবদ্ধ ভিত্তি-যদি বারবার দলীয় স্বার্থে পুনর্লিখিত ও খণ্ডিত হয়, তাহলে তা কেবল অতীতকে বিকৃতই করে না, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চেতনাকেও বিভ্রান্ত এবং বিভাজিত করে। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে ‘কারা মুক্তিযোদ্ধা’-এ প্রশ্ন নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হয়েছে। ফলে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা, স্বীকৃতি ও সুযোগ-সুবিধা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক পুঁজি হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে, যা ইতিহাসকে নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের পরিবর্তে দলীয় প্রতিযোগিতামূলক বয়ানে পরিণত করেছে।