যুদ্ধে না জড়িয়ে কেন কলকাঠি নাড়ছে পরাশক্তিগুলো?

বিডি নিউজ ২৪ অধ্যাপক ড. খালিদুর রহমান প্রকাশিত: ০৫ মার্চ ২০২৬, ১৮:৩৯

পরাশক্তিগুলো কখনোই নিছক নৈতিকতা, আদর্শ বা আবেগের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয় না—বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাস ঘেঁটে দেখলে এটা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। যুদ্ধ হোক বা সহযোগিতা, সবকিছুতেই তাদের অবস্থান নির্ধারিত হয় স্বার্থের আলোকে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ, ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া এবং বিশ্ব রাজনীতির অন্যান্য প্রধান খেলোয়াড়দের কূটনৈতিক অবস্থান এই সত্যটিকে আরও নগ্নভাবে সামনে এনেছে। বর্তমান পরিস্থিতি দেখায়, প্রতিটি শক্তিধর দেশ এমনভাবে পদক্ষেপ নেয়, যাতে সংঘাতের সময় তাদের কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও জ্বালানি স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে। তাই ইরানের অবস্থা হয়েছে পরাশক্তিগুলোর স্বার্থের রাজনীতিতে ক্যাকটাস বনে আটকাপড়া সিংহ ও সূর্যের গল্পের মতো।


মধ্যপ্রাচ্যে যে কোনো বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনা সরাসরি প্রভাব ফেলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। বিশ্বে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ব্যবহার হয়, যার প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ১৮ থেকে ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এই সংকীর্ণ জলপথ অতিক্রম করে। শুধু তেলই নয়, বৈশ্বিক তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির প্রায় এক-পঞ্চমাংশও এই পথ দিয়ে যায়। ফলে এই রুটে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৫ থেকে ১৫ ডলার পর্যন্ত ওঠানামা ঘটাতে পারে, যা আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর জন্য বড় ধাক্কা।


এমন পরিস্থিতিতে চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানিসহ বিভিন্ন শক্তিধর দেশের ভূমিকা নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই দেশগুলো কি সরাসরি যুদ্ধের অংশ হবে, নাকি কেবল কূটনৈতিক সমর্থনে সীমাবদ্ধ থাকবে? এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য বলছে, এই সব পরাশক্তি সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি, বরং কূটনৈতিক পর্যায়ে সমালোচনা ও শান্তির আহ্বান জানিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। এই অবস্থানও তাদের বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।


চীন বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি, যার মোট জিডিপি প্রায় ১৯ থেকে ২০ ট্রিলিয়ন ডলারের মধ্যে। দেশটি প্রতিদিন প্রায় ১১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল আমদানি করে, যা তাদের মোট ব্যবহারের প্রায় ৭০ শতাংশ। এর বড় একটি অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। সৌদি আরব, ইরাক ও সংযুক্ত আরব আমিরাত চীনের প্রধান সরবরাহকারী। ফলে হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা মানে চীনের জ্বালানি নিরাপত্তায় সরাসরি চাপ। শুধু তাই নয়, চীনের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি বৈশ্বিক বাণিজ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত; জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি পেলে উৎপাদন খরচ বাড়ে, যা তাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে। এ কারণেই তারা সামরিক অংশগ্রহণের বদলে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে আগ্রহী।


রাশিয়ার ক্ষেত্রেও চিত্রটি কৌশলনির্ভর। রাশিয়া প্রতিদিন প্রায় ৯ থেকে ১০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন করে এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিকারক। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তাদের অংশীদারত্ব প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি। তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে রাশিয়ার রপ্তানি আয়ে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে, তবে একই সঙ্গে বৈশ্বিক মন্দা তৈরি হলে চাহিদা কমে যেতে পারে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে রাশিয়া ইতিমধ্যেই বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকেছে, বিশেষ করে এশিয়ায়। এই অবস্থায় তারা এমন কোনো সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়াতে চায় না, যা তাদের অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাসকে বাধাগ্রস্ত করবে। ফলে তাদের ভূমিকা এখন পর্যন্ত জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মঞ্চে কূটনৈতিক অবস্থান গ্রহণেই সীমাবদ্ধ।


অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি, যার জিডিপি প্রায় ২৭ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি প্রতিদিন ১২ থেকে ১৩ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন করছে, যা তাকে শীর্ষ উৎপাদনকারীদের কাতারে নিয়ে গেছে। তবে তারা এখনও বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। তেলের দাম বৃদ্ধি দেশীয় উৎপাদকদের জন্য সুবিধাজনক হলেও, একই সঙ্গে তা ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ঘটাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রাস্ফীতির হার একসময় ৮ শতাংশের ওপরে উঠেছিল, যার পেছনে জ্বালানি দামের প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। ফলে সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রভাবও তাদের বিবেচনায় রাখতে হয়।


বিশ্ব জ্বালানি বাজার নিয়ন্ত্রণে ওপেক ও ওপেক প্লাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই জোটভুক্ত দেশগুলো সম্মিলিতভাবে বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ তেল উৎপাদন করে এবং প্রমাণিত মজুদের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ তাদের হাতে। সৌদি আরব একাই প্রতিদিন ১০ মিলিয়ন ব্যারেলের বেশি তেল উৎপাদন করতে সক্ষম। উৎপাদন কোটা সামান্য কমানো বা বাড়ানোই আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের মূল্য পরিবর্তন ঘটাতে পারে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা শুধু সামরিক বা রাজনৈতিক বিষয় নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য সরাসরি ঝুঁকি।


এদিকে ইউরোপীয় দেশগুলোর ভূমিকা মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রেক্ষাপটে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানিসহ ইউরোপের ৩০টিরও বেশি দেশ ন্যাটোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত। যদি যুক্তরাষ্ট্র জোটগত সমর্থন চায়, তবে তারা সীমিত সামরিক বা নৌ সহযোগিতা দিতে পারে, বিশেষত বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধের পর ইউরোপীয় দেশগুলো রাশিয়ান গ্যাস আমদানি কমিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি আমদানি বাড়িয়েছে। তাই হরমুজে অস্থিরতা মানে ইউরোপে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, শিল্প উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি। ২০২২ সালে ইউরোপে গ্যাসের দাম প্রতি মেগাওয়াট ঘণ্টায় ৩০০ ইউরো ছুঁয়েছিল।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও